মহামারী বাঁচিয়ে দিল বহু মানুষকে!

এক ভয়ংকর করোনা মহামারীতে সারা বিশ্ব আজ যখন বিপর্যস্ত, তখন সাত দশক আগে আরেক মহামারী প্রাণ বাঁচিয়ে দিয়েছিল বেশকিছু মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে।

সালটা 1943।রোম তখন নাৎসি জার্মানির দখলে।রোমে পাশ হচ্ছে একের পর এক ইহুদি বিরোধী বিধি নিষেধ।মুসোলিনির ইতালিয়ান সোস্যাল রিপাবলিক চলছে হিটলারের আঙ্গুলিহেননে। ফলে রোমান ইহুদি দের উপর শুরু করেছে অমানুষিক নির্যাতন, দমন পীড়ন,হত্যা। আর এইসব কিছুই রোমে ছড়িয়ে দিলো ‘কে সিনড্রোম’ নামক এক মহামারী।

রোগের প্রাণকেন্দ্র রোমের এক ছোট্ট দ্বীপ টিবার আইল্যান্ড এর ‘হাসপাতাল ফাতেবেনেফ্রাতেল্লি’। হাসপাতালে কে সিন্ড্রোম মহামারীর প্রধান চিকিৎসক জিওভানি বোরোমেও, ভিত্তরিও ইমানুয়েল সাচেরদোতি এবং অদ্রিয়ান ওসিসিনি।

টিবার আইল্যান্ড এর ‘হাসপাতাল ফাতেবেনেফ্রাতেল্লি’

1943 সালের 16ই অক্টোবর নাৎসিরা এক কুখ্যাত অভিযানে হাসপাতাল ফাতেবেনেফ্রাতেল্লি র ঠিক উল্টো দিকে অবস্থিত এক ইহুদি বন্দিশিবির থেকে একের পর এক ইহুদি নর নারী শিশুকে টেনে হিঁচড়ে বের করে ট্রাকে তুলছে।সেদিন মোট 1261 জন ইহুদিকে গেস্টাপরা তুলে নিয়ে যায় কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে।

নাৎসি ট্রাকে বন্দি ইহুদিগণ

হাসপাতালের সামনে তখন এই দৃশ্য দেখে রাগে ফুসছেন তীব্র ফ্যাসিবাদ বিরোধী ড: অদ্রিয়ানো।বাইরে প্রবল গোলমাল শুনে হাসপাতালের ভিতরের লোকজন জমা হয়েছে হাসপাতালের খোলা প্রাঙ্গণে।প্রবল হৈ হট্টগোল এর সুযোগে কয়েকজন ইহুদি প্রাণ বাঁচাতে ট্রাক থেকে নেমে ভিড়ের মধ্যে মিশে ঢুকে পড়েছে হাসপাতালের ভিতরে। কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না অদ্রিয়ানো ও তার সহকর্মী গিউলিও সাল্লা। অবশেষে তারা সিদ্ধান্ত নিলেন , যে ভাবেই হোক হাসপাতালে আশ্রয় নেওয়া মানুষ গুলির প্রাণ বাঁচাবেন। তখন তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন হাসপাতালে র প্রধান চিকিৎসক জিওভানি বোরোমেও । তারা বেশকিছু মানুষকে লুকিয়ে লুকিয়ে ঢুকিয়ে নিলেন হাসপাতালের ভিতরে।

ভিত্তরিও ইমানুয়েল সাচেরদোতি

এইদিন যতজন ইহুদি পালিয়ে হাসপাতালে ঢুকলেন,সাময়িক ভাবে তাদের সকলকে একটি ওয়ার্ডের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হলেও বোরোমেও জানতেন নাৎসিদের চোখে ধুলো দিয়ে বেশিদিন এদের নিরাপদে রাখা যাবে না।

জিওভানি বোরোমেও

তখনই আগমন ঘটল এই অদ্ভুত মারনরোগ যার নাম ‘কে সিন্ড্রোম’। নাৎসিবাহিনীর হাত থেকে আশ্রিত দের বাঁচাতে এক আশ্চর্য পরিকল্পনা করলেন বোরোমেও। তিনি প্রচার করলেন একটি অতি সংক্রামক মারন রোগ নতুন করে ফিরে এসেছে। এর উপসর্গ আরো আশ্চর্যের – খিঁচুনি,স্মৃতি হারানো,প্রবল কাশি এবং শেষে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে মৃত্যু। এই হাসপাতালে ‘কে ওয়ার্ড’ এ যারা ভর্তি আছে ,তারা প্রত্যেকে এই কে সিন্ড্রোম নামক বিরল রোগাক্রান্ত।

অদ্রিয়ান ওসিসিনি

‘কে সিন্ড্রোম’ নামটির মধ্যে লুকিয়ে আছে এক তীব্র শ্লেষ ও বিদ্রুপ। ‘কে’ শব্দ টি এসেছিল নাৎসি সেনাপ্রধান কেসেলরিং এবং পুলিশ অধিকর্তা কেপলার এর নামের আদ্যক্ষর থেকে।এই দুই নরপিশাচ বহু ইহুদিকে নির্বিচারে হত্যা করেছিল। তাই তাদের বিদ্রুপ করতেই এই রোগের এমন নামকরণ। প্রাণ বাঁচাতে যখন কোনো ইহুদি এই হাসপাতালে আশ্রয় নিত,তখন তাদের নামে ভুয়ো কাগজ পত্র তৈরি করে অসুখ হিসাবে লেখা হত কে সিন্ড্রোম। এই সময় পালিয়ে আসা সাধারণ ইহুদি দের পাশাপাশি ইতালির বহু ফ্যাসিবাদ বিরোধী স্বাধীনতাকামী বিশিষ্ট মানুষ হাসপাতাল ফাতেবেনেফ্রাতেল্লিতে আশ্রয় নেন।

কে ওয়ার্ড

এভাবেই চলতে থাকে সব কিছু। কিন্তু একদিন এক ডবল এজেন্ট এর মাধ্যমে খবর এল নাৎসিরা হাসপাতালে তল্লাশি চালাতে আসছে। দ্রুত হাসপাতালের বেসমেন্টে বসানো গোপন রেডিও ট্রান্সমিটার টিবার নদীর জলে ফেলে দেওয়া হলো।

যথা সময়ে নাৎসিবাহিনী এসে পুরো হাসপাতালে তল্লাশি চালিয়ে কিছু না পেয়ে এসে হাজির হলো কে ওয়ার্ডের সামনে। ওয়ার্ডের আশ্রিতদের আগেই সাবধান করে বলে দেওয়া হয়ে ছিল নাৎসিরা এলে তারা যেন ক্রমাগত কেশে যেতে থাকে,গলা দিয়ে বিকৃত আওয়াজ করতে থাকে। নাৎসিরা দরজার কাছে এলে ড: বোরোমেও শীতল গলায় তাদের বলেন ভিতরে যারা আছে , তারা সবাই বিরল অতি ছোঁয়াচে কে সিন্ড্রোম এ আক্রান্ত। একজনও ভিতরে ঢুকলে এই রোগ পুরো নাৎসি বাহিনীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে মড়ক ডেকে আনবে। ঘরের ভেতর থেকে নানান বিকৃত কণ্ঠস্বর , চিকিৎসকদের সতর্কবাণী -এই সবকিছু মিলিয়ে নাৎসিরা প্রবল আতঙ্কিত হয়ে ইঁদুরের মতো হাসপাতাল ত্যাগ করলো।

এরপর আর কোনোদিন মহামারীর কবলে পড়ার ভয়ে কে ওয়ার্ডের ধারেকাছে ঘেঁষেনি। সময় সুযোগ মতো হাসপাতাল থেকে আশ্রিত ইহুদি নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দেওয়া হতো।

আর প্রবল প্রাণসংশয় এর মধ্যেও ইহুদিদের রক্ষার কাজ করে গিয়েছেন তিন অসম সাহসী চিকিৎসক- জিওভানি বোরোমেও, ভিত্তরিও ইমানুয়েল সাচেরদোতি এবং অদ্রিয়ান ওসিসিনি। যারা মানবতাকে সবার উপরে স্থান দিয়েছিলেন।

তিন মানবদরদী চিকিৎসক

কে সিন্ড্রোম বলে বাস্তবে কোনো রোগই ছিল না।পুরোটাই ছিলো তিন চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এর তরফ থেকে ছড়ানো গুজব,যার একমাত্র কারণ নাৎসিদের হাত থেকে ইহুদি মানুষ এর প্রাণ বাঁচানো। সেই প্রথম কোনো এক মহামারী বাঁচিয়ে দিয়েছিল বহু সাধারণ মানুষকে।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান