মূলত কেনিয়া(Kenia) এবং তানজানিয়ায়(Tanjania)ছড়িয়ে রয়েছেন মাসাই (Maasai) জনজাতির প্রায় এগারো লক্ষ মানুষ। প্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়েও আজ প্রাচীন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরেই বসবাস তাঁদের। বেঁচে থাকা মূলত অরণ্যকে কেন্দ্র করেই। গৃহপালিত পশুর মাংসের পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর মাংসও তাঁদের খাদ্য তালিকার একটা বড়ো অংশ।

আফ্রিকাকে (Africa) একসময় বলা হতো অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ (Darkness continent)। উনিশ শতকে এখানে ইউরোপীয়(european) দের আগমনে সভ্যতার আলো পৌঁছলেও এখনো আফ্রিকার বহু স্থান পড়ে আছে গহীন অন্ধকারে।সেই সব স্থানে বসবাস করে নানা আদিম উপজাতি(primitive tribe)গোষ্ঠী। তবে সেখানেই আবার এমন একটি মনুষ্য গোষ্ঠী রয়েছে যারা আধুনিক প্রযুক্তিগত সভ্যতার সন্ধান পেয়েও আফ্রিকার আঁকড়ে ধরে রেখেছে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি। এরা হল মাসাই জনজাতি । তানজানিয়ার (Tanjania)উত্তরাংশ এবং কেনিয়ার(Kenia) মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণ ভাগ জুড়ে এদের বসবাস। অপরুপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এর টানে প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বহু মানুষ এখানে ঘুরতে আসেন । এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারা কতদিন নিজেদের প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারবে, তা বলা কঠিন। এবার জেনে নেওয়া যাক তাদের সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য।
ইতিহাসে মাসাই গোষ্ঠী :
এই পৃথিবীতে বসবাসকারী কোনো জাতিগোষ্ঠীর ই জন্ম নিবন্ধন(Date of Birth) দেওয়া সম্ভব নয় । তাই গোষ্ঠীর ইতিকথা জানার ক্ষেত্রে আমাদের উৎস হলো ইতিহাসের পাতা। ইতিহাস বলছে , মাসাইরা প্রাথমিকভাবে বাস করতো দক্ষিণ সুদানে। তারা বরাবরই যাযাবর(Normad)প্রকৃতির। সম্ভবত ষোড়শ শতকে উর্বর জমির খোঁজে তারা বর্তমান কেনিয়া ও তানজানিয়ায় এসে পৌঁছায়। সেই সময় এ অঞ্চলে আগে থেকেই অন্য গোষ্ঠীর বাস ছিলো। ফলত, তাদের সঙ্গে মাসাই দের সংঘর্ষ বাধে এবং শেষ পর্যন্ত তারা এই অঞ্চলের দখল নেয়।মাসাই জনগোষ্ঠী সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে বিংশ শতকে। এই সময়ে তারা রিফট ভ্যালি র প্রায় সবটুকু অংশ জুড়েই নিজেদের সাম্রাজ্য গড়ে নেয়। এখন কেনিয়া এবং তানজানিয়া জুড়ে মাসাইদের জনসংখ্যা প্রায় এগারো লক্ষের কাছাকাছি। এই জনগোষ্ঠী সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে বিংশ শতকে। এই সময়ে তারা রিফট ভ্যালি (Great Rift Vally)র প্রায় সবটুকু অংশ জুড়েই নিজেদের সাম্রাজ্য গড়ে তোলে । এখন কেনিয়া(kenia) এবং তানজানিয়া(Tanjania) জুড়ে মাসাইদের জনসংখ্যা প্রায় এগারো লক্ষের কাছাকাছি।
ভাষা:
নিজেদের মাতৃভাষা(Mother Tongue) ‘মা'(Maa)তেই কথা বলে। এই ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা তারা ব্যবহার করে না।এই মাতৃভাষাই তাদেরকে একই ধরনের অন্য কিছু আদিবাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে সাহায্য করে। তেমনই একটি গোষ্ঠী হল সামবুরু গোষ্ঠী (samburu), যারা মাসাই গোষ্ঠীর সাথে ভাষার মাধ্যমে যুক্ত।

শাসনতান্ত্রিক কার্যক্রম :
মাসাইরা সম্পূর্ণ ভাবে তাদের নিজস্ব প্রাচীন সাংস্কৃতিক রীতিনীতি মেনে চলে । এই আদিবাসী গোষ্ঠী পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা(social system) মেনে চলে। আইন হিসেবে তারা বহু বছরের প্রচলিত মৌখিক আইন মেনে চলে। মৃত্যুদণ্ডের প্রচলন না থাকলেও জরিমানার প্রচলন আছে। এই জরিমানা দিতে হয় গৃহপালিত পশুর মাধ্যমে। গৃহপালিত পশু এ গোষ্ঠীর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জনগোষ্ঠীর শারীরিক গড়ন :
মাসাই জনজাতি নারী পুরুষ প্রত্যেকেই দীর্ঘদেহী হয়ে থাকে। এদের জীবনযাত্রার ধরনের কারণে শরীর পেশিবহুল হয়। নারী পুরুষ নির্বিশেষে এরা মাথা কামিয়ে রাখে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হচ্ছে, মাসাইরা যোদ্ধা। মাসাইদের মধ্যে লিঙ্গ নির্বিশেষে শরীরে উল্কির প্রচলন আছে । এরা সবাই কৃষ্ণবর্ণ।


বাসগৃহ :
মাসাইদের ঘরগুলো সাধারণত তৈরি হয় গাছের সরু কাণ্ডের বেড়া এবং ঘাস বা খড়ের ছাউনি দিয়ে । কাদা-বিষ্ঠা-ছাই সব মিলিয়ে ঘর বানানোর উপাদান তৈরি করা হয়।ঘরগুলো কোনটা গোল , কোনটা চৌকো আবার কোনটা আয়তাকার হয়ে থাকে। এই ঘরগুলোকে বলা হয়ে থাকে বোমা(Bomaa)। মেয়েরা রান্নার জন্য অথবা স্টোর রুম হিসেবে ব্যবহার করার জন্য ছোট ছোট কিছু ঘর তৈরি করে, যার নাম এনকাজি(Enkaji)। মাসাই গ্রামকে বলা হয়ে থাকে মানয়াত্তা। গ্রামের চারপাশ স্থানীয় গাছ থেকে সংগ্রহ করা ক্রাল(Cral) নামক একধরনের কাঁটা দিয়ে ঘেরা থাকে । এর প্রধান কারণ হল ঘরবাড়িকে বন্যপ্রাণী, বিশেষত , ভয়ঙ্কর সিংহের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য।

খাদ্য :
মাসাই গোষ্ঠীর প্রিয় খাবার হলো বিভিন্ন বন্য প্রাণীর মাংস। তবে এরা খাদ্য হিসেবে শাকসবজিও গ্রহণ করে। তবে তার পরিমাণ কম। এছাড়া তাদের প্রিয় খাবারের তালিকায় আছে গরু, মহিষ বা ছাগলের দুধ। প্রথা অনুযায়ী তাদের মাঝে প্রাণীর রক্ত খাবার প্রচলনও রয়েছে। সেটা বিশেষ উপলক্ষ অনুযায়ী; যেমন- কেউ অসুস্থ থাকলে অথবা নারীরা সন্তান জন্মদানের পর। যোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ থাকে ওলকিরটি গাছ থেকে তৈরি বিশেষ ধরনের উত্তেজক পানীয়।

পোশাক :
পোশাকের ব্যাপারে এই জনগোষ্ঠী খুবই রঙিন।এই পোশাকের নাম স্যুকা(Syuka)। পোশাকের ক্ষেত্রে দেখা যায় নানান রঙ এর ব্যবহার । পোশাক অনেকটা গামছার মতো দেখতে হয়। সাধারণত রঙিন থান প্যাঁচ দিয়ে পোশাক বানানো হয়। ছেলেদের এই প্যাঁচ দেবার ধরনকে বলা হয় কিকই(Kikii)। মেয়েদের প্যাঁচ দেবার ধরনটা ছেলেদের থেকে ভিন্ন এবং একে বলা হয় কাংগা(Kanga)।

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে রঙিন গহনার ব্যবহারও দেখা যায়। উভয়ই হাতে কাঠের ব্রেসলেট পরে। রমণীরা গলায় গোল রিং এর মতো এক ধরনের গহনা ব্যবহার করে। তাদের গহনা এবং সাজ থেকে অনেক সময় সামাজিক অবস্থান আন্দাজ করা যায়। যেমন- ভারি কাজের গহনা গণ্যমান্য ব্যক্তিরা পরেন। আবার একমাত্র যোদ্ধারাই মাথায় পালকের মুকুট (Crown)পরতে পারেন।
তাদের পোশাকের সাদা রঙ হচ্ছে শান্তির (peace) প্রতীক। লাল রঙ সাহসিকতার(Bravery) প্রতীক। তাদের অস্ত্রেও লাল রঙের পোচ থাকে । বর্মের ওপরে থাকে বিভিন্ন ধরনের কাদা এবং লাল মাটির প্রলেপ।
বিবাহ রীতি :
মাসাই গোষ্ঠীর পুরুষদের মধ্যে বহুগামিতার(Polygamy) প্রচলন আছে এখনো। এই বহুগামিতা তাদের কাছে শখের চেয়ে বেশি প্রয়োজন সামাজিক মাপকাঠির বিচারের জন্য । কেননা মাসাই সম্প্রদায়ে অর্থবিত্তের পরিমাপক হচ্ছে সন্তান এবং গৃহপালিত পশু। যে যত বেশি সম্পদশালী, তার সন্তান এবং পালিত পশুর সংখ্যা ততটাই বেশি। তাদের মাঝে জন্মনিয়ন্ত্রণের (Birth Control)কোনো প্রচলন নেই। তাই সংসার এবং এই গৃহস্থালি একসাথে দেখাশোনা করা একজন স্ত্রী র পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলস্বরূপ নতুন স্ত্রী আনা হয় প্রথমজনের সহকারী হিসেবে।

তবে রীতিনীতিতেও কিছুটা বদল এসেছে। যেমন- অতীতে মেয়ের বাবা পাত্র ঠিক করতো। কিন্তু এখন অনেকক্ষেত্রেই নিজেরা নিজেদের সঙ্গী পছন্দ করছে । আর বহুগামিতাতেও(polygamy) তাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে প্রথম স্ত্রী হওয়া সবসময়ই সম্মানের বিষয় হিসেবে দেখা হয়। বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ের বাবাকে সম্মান দেয়াও তাদের রীতি। সাধারণত ছাগল বলি দেয়ার মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শন করা হয়।
সামাজিক অনুষ্ঠান :

মাসাই জনগোষ্ঠীর যাবতীয় আচার অনুষ্ঠানের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে বৃষ্টি(Rain)। সবকিছুর সাথে বর্ষাকালের সম্পর্ক রয়েছে। সব অনুষ্ঠানেই মাসাই দের প্রথাগত নাচগানের ব্যবস্থা থাকে। প্রধানত, পুরুষরাই এতে অংশ নেয়। ইউনোটো, কুডো এরকম কিছু আঞ্চলিকভাবে তৈরি বাদ্যযন্ত্র(Instrument) তাদের গানে ব্যবহৃত হয়। মেয়েরা সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারে না। তবে তাদের অনুষ্ঠান উপভোগ করার ক্ষেত্রে কোনো বিধিনিষেধ নেই।
তাদের নাচ দেখতে হাই জাম্পের (High jump)মতো লাগতে পারে। এই লাফ দেবার ধরনকে বলা হয় ‘আডুমু'(Aadumu)। এই নাচের একটি অন্যতম প্রধান আঙ্গিক হল ছন্দবদ্ধ ভাবে ঘাড় সঞ্চালন।
ধর্মবিশ্বাস :
এরা একেশ্বরবাদী (Monotheist)। ‘লাইবন'(Libon) নামে একজন থাকেন, যিনি একইসঙ্গে ধর্মযাজক এবং সামাজিক অভিভাবক। তাদের ঈশ্বরের নাম এনকাই । যদিও তারা এক ঈশ্বরে বিশ্বাসী, তবু নীতেরকব নামে একজনকে তারা গৌণ দেবতা হিসেবে মানে। ধারণা করা হয়, এই দেবতা মানুষ এবং ঈশ্বরের মাঝে মধ্যস্থতাকারী।
মাসাইদের কিছু ভ্রান্ত ধারণা :
মাসাই জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনো রয়েছে পুরোনো প্রথা,রীতিনীতি কে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার প্রবণতা। তবে এই মানসিকতা অনেক ক্ষেত্রেই পরিবেশ , বন্যপ্রাণসহ তাদের সামাজিক বিষয়েও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।
স্মরনাতীত কাল ধরেও বন্যপ্রাণী এবং মাসাইরা পাশাপাশি বাস করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমবর্ধমান আধুনিক সভ্যতা বিস্তারের ফলে সারা বিশ্বেই বন্যপ্রাণী আলাদাভাবে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে। বিশ্বের ৫০% সিংহ এই অঞ্চলে বাস করে। কিন্তু এখনো মাসাই যোদ্ধাদের কাছে ঐতিহ্যের কারণে সিংহ শিকার একটি বির্যবত্তার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয় । তবে ইতোমধ্যেই এবিষয়ে মাসাই দের সচেতন করতে সরকারী ও বেসরকারি সংস্থা কাজ করছে এবং সিংহ শিকারের হারও অনেকটাই কমে এসেছে।
আবার এই সম্প্রদায়ের মনে শিক্ষা নিয়েও একধরনের অনীহা কাজ করে। এই অনীহার ফলস্বরূপ নানান রোগ এবং কুসংস্কার এখনো তাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এখনো চিকিৎসার ক্ষেত্রে এরা নিজেদের প্রাচীন পদ্ধতিতেই বিশ্বাসী । মুমূর্ষু রোগীদের তাই অনেক ক্ষেত্রেই বাঁচানো সম্ভব হয় না।
শেষের কথা :
বইয়ের পাতার বাইরে যে এমন একটি গোষ্ঠী আজকের বিশ্বায়নের যুগেও থাকা সম্ভব, তা প্রায় কল্পনাতীত। এমন নয় যে তারা আধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তির কথা জানে না। জীবনের অনেক ক্ষেত্রে তারা প্রযুক্তিকে গ্রহণ করলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা এখনো দূরত্ব বজায় রাখতেই অভ্যস্ত । সামাজিক রক্ষণশীলতার বাইরে এখন অনেকেই পড়াশোনা করার আগ্রহ প্রকাশ করে। বিভিন্ন সংগঠন, মিশনারীর দৌলতে অনেক মাসাই খ্রিস্টান (Chirst) এবং ইসলাম(Islam) ধর্ম গ্রহণ করেছে।
বহু বছর নানান প্রতিকূল পরিস্থিতি ও বন্যজন্তুর সঙ্গে লড়াই করে নিজেদের টিকিয়ে রেখেছে এই জনগোষ্ঠী। তাদের মাঝে প্রচলিত কুসংস্কার যেমন দূর করা দরকার, সেভাবেই তাদের গ্রামীণ, বিশুদ্ধ, যাযাবর জীবন ও নিজস্ব কৃষ্টি সংরক্ষণ করাটাও কর্তব্য। জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং আধুনিক জীবনযাপনের চাপের মুখে ইতোমধ্যেই অনেক কিছু হারাতে বসেছে এ সম্প্রদায়। আন্তজার্তিক সংস্থাগুলির (International Organisation)এবিষয়ে দৃষ্টি দেওয়ার সময় এসেছে।
