আরিফ খান (Arif Khan)। কোনো সহ-খেলোয়াড় নেই তাঁর। ভারতের পতাকা হাতে তিনি একাই প্রতিনিধিত্ব করছেন তার মাতৃভূমির। ক্রীড়াক্ষেত্রের দিক থেকেই হোক কিংবা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে— বেজিং অলিম্পিক গেমসে ভারতের একমাত্র প্রতিযোগী তিনি।

চলছে বেজিং (beijing)শীতকালীন অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। সেজে উঠেছে বেজিং-এর দ্য বার্ডস নেস্ট স্টেডিয়াম (The Birds Nest Stadium)। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মার্চপাস্ট এ অংশ নেয় ৮৪টি দল। তার মধ্যেই আরিফ খানের নেতৃত্বে চারজনের ছোট্ট ভারতীয় দল ২২টি দেশের পর ২৩তম দেশ হিসেবে তেরঙ্গা হাতে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করে । ৮৪ দেশের বড় ভিড়ের মধ্যে তাঁকে দলছুট মনে হওয়াই স্বাভাবিক। তিনি আরিফ খান (Arif Khan)। না, কোনো সহ-খেলোয়াড় বা সহ-প্রতিনিধি নেই তাঁর। ভারতের পতাকা হাতে তিনি একাই প্রতিনিধিত্ব করছেন তার মাতৃভূমির। ক্রীড়াক্ষেত্রের দিক থেকেই হোক কিংবা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে— বেজিং অলিম্পিক গেমসে ভারতের একমাত্র প্রতিযোগী তিনি। অলিম্পিকে প্রথম ভারতীয় স্কিয়ারও বটে। বলতে গেলে একক প্রচেষ্টাতেই তিনি ভারতকে তুলে এনেছেন উইন্টার অলিম্পিকের (Winter Olympics) মঞ্চে।
হ্যাঁ, একক প্রচেষ্টাতেই। কারণ, জাতীয় ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলির থেকে সেই অর্থে কোনো সাহায্যই পাননি তিনি। কাজেই বলার অপেক্ষা থাকে না, এই লড়াই খুব সহজ ছিল না তাঁর কাছে।

আগামী ১৩ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি স্কিইং বিভাগের স্লালম ও জায়ান্ট স্লালম ইভেন্টে জম্বু কাশ্মীরে র বাসিন্দা আরিফ। এই প্রথম শীতকালীন অলিম্পিকের একটি আসরে একজন ভারতীয় প্রতিযোগী দুটি ইভেন্টে অংশ নিতে চলেছেন।

কাশ্মীরের গুলমার্গের এক দরিদ্র পরিবারে বড়ো হয়ে ওঠা আরিফের। বাবা ছিলেন স্কিইং গাইড। শীত পড়লেই গুলমার্গ ঢেকে যায় শ্বেতশুভ্র বরফের চাদরে। আর এই মনোরম পরিবেশে শখের স্কিইং ও স্কেটিং করতে ভিড় জমান হাজার হাজার মানুষ। এই সময়টার ওপরেই নির্ভর করে থাকে আরিফের পরিবার। তাছাড়া একটা ছোটো স্কিইং সামগ্রী বিক্রির দোকান আছে বটে। তবে সারাবছর তাতে বিক্রি হয় না বললেই চলে।
আরিফ বলছেন, ”আমার স্বপ্ন অবশেষে সত্যি হয়েছে। যে স্বপ্নের পিছনে আমি এতদিন ধাওয়া করে এসেছি, সেটাই সফল হয়েছে। এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। আমার বাবা আমাকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই স্বপ্নও সত্যি হয়েছে।” বেজিংয়ে রওনা হওয়ার আগে গুলমার্গে গিয়েছিলেন আরিফ। এখান থেকেই তো শুরু হয়েছিল তাঁর অভিযান। দিল্লির বিমানে ওঠার আগে গুলমার্গের মানুষজনের আশীর্বাদ নিয়েছেন আরিফ। তিনি তার এই লড়াইয়ের কথা বলতে গিয়ে বলেন, “খুব সহজ কাজ ছিল না। আমাকে কঠিন লড়াই করতে হয়েছে। ১৯৯৪ সালে আমি স্কি শুরু করেছিলাম। ২০০৮ থেকে পেশাদার স্কি-তে আমি।” সরকারের ভূমিকার কথা প্রশংসা করেছেন আরিফ। তিনি বলছেন,”সরকারের কাছ থেকে আমি খুব সাহায্য পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল খেলাটাকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিল সরকার। আমাকে সবধরনের সাহায্য করেছিল।” আরিফ আরও বলেন, “গুলমার্গ (gulmarg)পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর জায়গা। এখানে স্কি করার সুযোগ সুবিধা রয়েছে। সারা পৃথিবীর আকর্ষণও রয়েছে গুলমার্গের প্রতি। গুলমার্গ, কাশ্মীর এবং দেশকে গর্বিত করার চেষ্টা করব। ১৪০ কোটি মানুষের প্রতিনিধি হয়ে যাচ্ছি আমি। চেষ্টা করবো যাতে সম্মান হানি না হয়।”
২৩ বছর বয়সী আরিফের মাত্র চার বছর বয়সে বাবার কাছেই স্কিইং-এ হাতেখড়ি । তারপর ধীরে ধীরে প্রবেশ করা পেশাদার খেলার জগতে। প্রথম কোনো বড়ো সাফল্য মেলে ২০০৫ সালে। ১২ বছর বয়সে জাতীয় মিটে (National Meet)সোনা আনেন আরিফ। আরও চার বছর পর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আত্মপ্রকাশ। 2011 সালে দক্ষিণ এশিয় শীতকালীন গেমসে স্কিইং বিভাগের স্লালম ও জায়ান্ট স্লালম ইভেন্টে জোড়া সোনার পদক জয় করেন আরিফ । রাজনৈতিক সংকটে দগ্ধ কাশ্মীরের প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে অনুশীলনের অসুবিধা তো ছিলই। শীতকালের সময়টুকুই শুধু বরফ পেতেন আরিফ। বাকি সময়টায় প্রশিক্ষণ নেওয়া কিংবা অনুশীলনের সুযোগ ছিল না বললেই চলে।
তবে আজ থেকে আড়াই দশক আগেও এমন পরিস্থিতি ছিল না ভারতে। উইন্টার গেমসের জন্য ছিল বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। ১৯৯৮ সালে শীতকালীন সমস্ত খেলাকে অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে বাতিল করে ভারত সরকার। তারপর আর নতুন করে পুনর্স্থাপিত হয়নি শীতপ্রধান খেলাধুলোর ফেডারেশন। ফলে, ভারতের শীতকালীন খেলায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের পরিমাণও এসে ঠেকে তলানিতে।

১৯৬৪ সাল থেকে বিভিন্ন শীতকালীন অলিম্পিকে ভারত অংশ নিয়েছে। ভারতের প্রথম অলিম্পিক ১৯২০ সালে। সেই ভারতীয় অলিম্পিক দলে ছিলেন দুজন কুস্তিগির, দুজন অ্যাথলেট ও একজন ম্যানেজার। চার খেলোয়াড়ের মধ্যে ফাদেপ্পা দারেপ্পা চাউগুলে ম্যারাথনে তার ইভেন্ট সম্পূর্ণ করেন। তিনি ২ ঘণ্টা ৫০ মিনিট ৪৫.৪ সেকেন্ডে ৪২.৭৫০ কিলোমিটার দৌড়ে ১৯তম স্থান অধিকার করেছিলেন।
২০১৮ সালেই অলিম্পিকে খেলার সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল আরিফের কাছে। উইন্টার অলিম্পিকে অংশ নিতে গেলে, যোগ্যতা অর্জন করতে হয় পাঁচটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়। তার মধ্যে চারটি বাধাই অতিক্রম করে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পঞ্চমটি আর সম্ভব হয়নি অর্থের অভাবে। প্রতিযোগীর তালিকাতে তাঁর নাম থাকলেও, অর্থের অভাবে বিদেশভ্রমণ করতে পারেননি তিনি।
চলতি অলিম্পিকে অংশগ্রহণের আগেও সেই একই প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল আরিফকে। ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক স্কি ফেডারেশন (International Ski Federation)ভারতের স্কি ও স্নোবোর্ডের খেলোয়াড় সংগঠনকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিলেও বদলায়নি পরিস্থিতি। ক্রাউড ফান্ডিং-এর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেই বিদেশে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হয়েছে তাঁকে। সমস্ত সঞ্চয় খুইয়ে দিনের পর দিন অনুশীলন করতে হয়েছে দুবাইয়ের কৃত্রিম স্কিইং গ্রাউন্ডে। আরিফের অভিমত, অলিম্পিকের যোগ্যতা অর্জন করা, দেশের হয়ে অলিম্পিকের মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করাই তাঁর কেরিয়ারের শ্রেষ্ঠ সাফল্য। আমেরিকা, জাপান, তুরস্ক, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে , লেবানন, অস্ট্রিয়ায় অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছেন আরিফ। ১২৭টি আন্তর্জাতিক ইভেন্টে অংশ নেন তিনি। এবার গোটা দেশের চোখ তাঁর দিকে। লক্ষ্য একটাই – দেশকে গর্বিত করা এবং বেজিং থেকে সোনা জেতা। তবে জয় কি আসবে? উত্তর দেবে সময়ই। আর আরিফের এই লড়াই হাজার হাজার কাশ্মিরী তরুণের কাছে অনুপ্রেরণা। তাঁর দিকে তাকিয়েই স্বপ্ন বুনছে গোটা দেশ। তার হাত ধরেই হয়তো দ্য বার্ডস নেস্ট স্টেডিয়ামে বেজে উঠবে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত
