
ঠিক এক বছর আগেই বিপুল আশা জাগিয়ে বাংলা দখলের স্বপ্ন দেখেছিল তাঁরা। বাংলা জুড়ে স্লোগান উঠেছিল, ‘ইস বার, দোশো পার’। সেই স্বপ্ন যদিও দিনের আলো দেখেনি , ভেসে গিয়েছিল গঙ্গার স্রোতে। মাত্র ৭৭ ই থেমে গিয়েছিল রথ।
বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় বিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে একক ভাবে উঠে এসেছিল বিজেপি। এই প্রথম বার বাম ও কংগ্রেসের স্থান শূন্য হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় । ফলে লড়াইটা হওয়ার কথা ছিল শাসক তৃণমূল বনাম বিরোধী বিজেপির মধ্যে। কিন্ত গত এক বছরে ক্রমশ শক্তি ক্ষয় হয়েছে বিজেপির। যত দিন যাচ্ছে, বিজেপির অস্তিত্ব কার্যত প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
আর এই অবসরে ফের যেন বিরোধী পরিসরে মাথা তুলছে বামেরা। বিধানসভা নির্বাচনের সময় থেকেই বিভিন্ন জায়গায় এই প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, যা বজায় রইল পশ্চিমবঙ্গের ১০৮ পুরভোটের ফলাফলেও। ফলাফলের ভিত্তিতে মাত্ৰ একটি পৌরসভা দখল করলেও অধিকাংশ জায়গাতেই দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে বাম।
উত্তরে পাহাড় থেকে শুরু করে দক্ষিণে বালুমাটি সমুদ্র উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত বঙ্গের মোট ১০৮টি পুরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় গত রবিবার। দীর্ঘদিন আগে মেয়াদ উত্তীর্ণ হলেও করোনা কালে পুরসভাগুলিতে প্রশাসক বসিয়ে কাজ চালানো হচ্ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল এই পুরসভাগুলিতে। ভোটের দিন বেশ কিছু জায়গা থেকে উঠে আসে অশান্তির ছবি। বেশ কিছু জায়গায় বিরোধী দলের তরফে ছাপ্পার অভিযোগ জমা হয় । সন্ত্রাসের অভিযোগে সরব হয় বিজেপি। সোমবার এর প্রতিবাদে ১২ ঘন্টা বাংলা বন্ধও পালন করে বিজেপি ।কিন্তু যেভাবে তাহেরপুরে বামেরা কিংবা দার্জিলিং হামরো পার্টি নিজেদের দখলে রাখল, সেখানে বিজেপি-র পতনের জন্য শুধুই কি সন্ত্রাসই দায়ী, প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
রাজ্যজুড়ে সবুজ ঝড়ের মধ্যেই তাহেরপুর পুরসভা পুনরায় দখল করল বামেরা। এই পুরসভায় ৮টি ওয়ার্ডে বামফ্রন্ট এবং পাঁচটিতে তৃণমূল জয়ী হয়েছে ।
এদিকে, মাত্র ছ’ মাস আগে গঠিত হওয়া হামরো পার্টি (Hamro Party) দখল করল দার্জিলিং (Darjeeling) পুরসভা৷ গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা, জিএনএলএফ, তৃণমূলের মতো প্রধান দলগুলিকে পিছনে ফেলে দার্জিলিং পুরসভা দখল করে নিল অজয় এডওয়ার্ডের (Ajay Edward) নতুন রাজনৈতিক দল৷ যদিও অজয় এডওয়ার্ডের নিজে পরাজিত হয়েছেন । আর যে দার্জিলিং নিয়ে এতদিন পাহাড়ে নিজেদের ক্ষমতার বড়াই করত বিজেপি, সেই দার্জিলিং পুরসভায় খাতাই খুলতে পারল না বিজেপি-জিএনএলএফ জোট৷ পাহাড়ের সাংসদ, বিধায়ক সবই বিজেপি-র। আর সেখানেই কিনা বিজেপি খাতাই খুলতে পারল না। তবে, দু’টি আসনে জয়ী হয়েছে তৃণমূল৷ শুধু দার্জিলিং নয় , গোটা উত্তর বঙ্গেই বিধানসভা নির্বাচনের নিরিখে ব্যাপক শক্তি ক্ষয় হয়েছে বিজেপির।
আবার, বিজেপি সাংসদ অর্জুন সিংয়ের গড় বলে পরিচিত ভাটপাড়ায় বিজেপির প্রভাব বিলীন হয়ে গেল। ভাটপাড়া পুরসভা দখল করে নিল তৃণমূল। ভাটপাড়ার ৩৩টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১ আসনে প্রার্থীর মৃত্যুর জন্য ভোট হয়নি। কিন্তু ৩২টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩০টি ওয়ার্ড দখল করেছে তৃণমূল। ২০১৯ সালের লোকসভার পরে তৃণমূল কাউন্সিলরদের দলে টেনে যে সাতটি পুরসভার দখল নিয়েছিল বিজেপি , তার মধ্যে ছিল ভাটপাড়াও। তবে ধীরে ধীরে সব ক’টিই হাতছাড়া হয়েছিল তাদের। ভাটপাড়া পুরসভার ৩৪ সদস্যর মধ্যে ১৯ জন তৃণমূল কাউন্সিলর ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যে গেরুয়া ঝড়ের পর যোগ দিয়েছিলেন বিজেপি-তে। এর পরে আরও কয়েক জন গেরুয়া শিবিরে যোগ দিলেও জুন মাসে দেখা যায়, বিজেপি-র দিকে রয়েছেন ২৬ জন সদস্য। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁদের মধ্যে থেকে ১২ জন কাউন্সিলর তৃণমূলে ফিরে আসেন। ফলে ক্ষমতা ফিরে পায় তৃণমূলই।
এদিকে, ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু হতে-হতে ফের ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বামেরা। তাহেরপুর পুরসভা দখল করাই শুধু নয়, বিধানসভা ভোটের পর থেকে যা ভোট হচ্ছে, সবেতেই দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসছে বামেরা। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই যে প্রশ্নটি মাথাচাড়া দিচ্ছে, তাহলে কি ফের মুখোমুখি তৃণমূল ও বাম। বিজেপি কি ক্রমেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে বঙ্গ রাজনীতিতে?
