বোটানিক্যাল গার্ডেন পেরিয়ে হুগলী নদীর দুই তীরে বেলুড় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে সুন্দরবনের লবণাম্বু উদ্ভিদগুলি ।
‘ দাও ফিরে সে অরণ্য ,লও এ নগর ‘ কবিগুরুর এই আকাঙ্খা যেন বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে। ম্যানগ্রোভ অরণ্যের কথা ভাবলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুন্দরবনের সুন্দরী , গরান , গেওয়া , হোগলা , কৃপাল , বায়েন , হাড়গোজা , সমুদ্র , পানলতা , গোলপাতার সারি , স্বাসমূল আর ঠেস মূলের বিস্তৃত জলাভূমি।
যদিও এবার ম্যানগ্রোভ দেখতে সুন্দরবন (Sundarban) যাওয়ার দরকার নেই । ম্যানগ্রোভ এখন শিবপুর আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ভারতীয় বোটানিক্যাল গার্ডেন (Acharya Jagadish Chandra Bose Indian Botanic Garden) সংলগ্ন গঙ্গার পাড়েই । হ্যাঁ , শুনতে আশ্চর্য লাগলেও এখন গঙ্গার জলেই গজিয়ে উঠছে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ।গঙ্গার পাড়ে ম্যানগ্রোভের অরণ্য নিয়ে চিন্তার ভাঁজ বিজ্ঞানীদের কপালে।

বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global warming) এর প্রভাবের ফলেই সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ চলে এসেছে হাওড়া (Howrah) র পাড়ে বোটানিক্যাল গার্ডেনে । তবে এই ধরণের ঘটনা নিয়ে চিন্তিত বোটানিক্যাল গার্ডেনের উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা । প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণেই এই স্থানবদল বলে প্রাথমিক অনুমান উদ্ভিদ বিজ্ঞানীদের ।
ম্যানগ্রোভ এক বিশেষ ধরনের উদ্ভিদ যা লবণাক্ত জলে জন্মায় । এই উদ্ভিদের শ্বাসমূল মাটির ওপরে বেরিয়ে থাকে এবং এই শ্বাসমূলের মাথায় নিউমাটাপোর নামে শ্বাসছিদ্র থাকে । এই গাছের ফল শাখা থেকে খসে পড়ার আগেই অঙ্কুরিত হয়ে থাকে । তাই মাটিতে পড়তেই সরাসরি মূল বিস্তার করতে পারে । এখানে এখন দেখা মিলেছে বিরল প্রজাতির ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ ‘ ওরা’র । এর বিজ্ঞানসম্মত নাম সনেরাশিয়া গ্রিফিথি (Sonneratia Griffithii)। এ ছাড়াও কৃপাল , বায়েন , হাড়গোজা , সমুদ্র , পানলতার মতো গাছগুলিও প্রাকৃতিক কারণেই সরে এসে বাসা বেঁধেছে বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাশে ।
বোটানিক্যাল গার্ডেন পেরিয়ে হুগলী নদীর দুই তীরে বেলুড় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে সুন্দরবনের লবণাম্বু উদ্ভিদগুলি । প্রকৃতিগত ভারসাম্যের তারতম্যজনিত কারণেই সঠিক প্রাকৃতিক পরিবেশ পেয়ে এখন ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে সেই গাছগুলি ।
তবে এই উদ্ভিদ – গুলির এমন সরে আসার বিষয়টিকে বিপদ সংকেত বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরাও । সম্ভবত , সমুদ্রের জলে লবণের পরিমান বেড়ে যাওয়ার ফলেই এই বিশেষ উদ্ভিদগুলির পক্ষে বংশবিস্তার ও জীবনধারণের অনুকুল পরিবেশ আর মিলছে না সুন্দরবন এলাকায় । আর তাই অনুকূল পরিবেশের সন্ধানে সুন্দরবন থেকে সরে আসছে ম্যানগ্রোভ।গঙ্গার পার বরাবর ম্যানগ্রোভ বেড়ে উঠতে দেখে তখনই শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন , গঙ্গার পাড় বরাবর দু – কিলোমিটার জায়গা জুড়ে তৈরি করা হবে ম্যানগ্রোভ অরণ্য ।
আরো দেখুন দূরসম্পর্কের বোন বিজয়া হয়ে উঠেছিলেন সত্যজিৎ জায়া
এখানকার উদ্ভিদ বিজ্ঞানী বসন্ত সিংহ জানান , গত দশ বছর ধরেই এই পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছিলেন তাঁরা । সমুদ্রের জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় গঙ্গার মিঠে জলে মিশে যাচ্ছিল সমুদ্রের নোনা জল । তাই শুধু শিবপুরের গঙ্গার পাড় নয় , গঙ্গার উপর অন্যত্রও মিলেছে ম্যানগ্রোভের খোঁজ । সমুদ্রের জলস্তর বেড়ে যাওয়া যেমন একটা কারণ , তেমনই ইনওয়ার্ড মাইগ্রেশনও এর অন্যতম কারণ বলে তিনি জানান । তিনি বলেন , বসবাসের জন্য সুন্দরবনে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ম্যানগ্রোভ অরণ্য । তাই ইনওয়ার্ড মাইগ্রেশন হচ্ছে । ওই সব গাছের বীজ ভেসে এসে অনুকূল পরিবেশে গাছ জন্মাচ্ছে ।

উল্লেখ্য , ২০০৬ সাল থেকে বোটানিক্যাল গার্ডেনে ম্যানগ্রোভ সংক্রান্ত গবেষণা শুরু হয়েছে । সেই সময় ভারত ও আফ্রিকার অ্যামাজন অববাহিকার প্রায় ২০ টি ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের চারা রোপণ করা হয় , এই বাগানের বেড়াতে এসে যেমন ম্যানগ্রোভ অরণ্য দেখতে পাবেন , পাশপাশি গাছ সংরক্ষণ ও গবেষণাও করা যাবে। তাই বাঘের দেখা হয়তো মিলবে না , কিন্তু শহর থেকে অল্প দূরেই গঙ্গায় নৌকো নিয়ে ভেসে পড়লেই এ বার দেখা মিলবে এক টুকরো সুন্দরবনের ।

4 thoughts on “সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ সরে আসছে হাওড়ার দিকে , আশঙ্কিত বিজ্ঞানীরা”