বঙ্গাব্দের সূচনা কার হাতে ?

আজ নতুন বাংলা বর্ষ ১৪২৯ এর শুভ সূচনা। এই সূচনা লগ্নে আলোকপাত করা যাক বঙ্গাব্দের উৎপত্তির উপর।

বঙ্গাব্দের সূচনা সম্পর্কে দুটি মত প্রচলিত আছে প্রথম মত অনুযায়ী বঙ্গাব্দের সূচনা হয় গৌড়ের শাসক শশাঙ্ক র হাত ধরে আর দ্বিতীয় মত অনুযায়ী বঙ্গাব্দের সূচনা করেন মোগল সম্রাট আকবর

আবার কিছু ঐতিহাসিক এর মতে, বাংলা বর্ষপঞ্জি এসেছে ৭ম শতকের হিন্দু রাজা শশাঙ্কের কাছ থেকে। আকবরের সময়ের অনেক শতক আগে নির্মিত দুটি শিব মন্দিরে বঙ্গাব্দ শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়। আর এটাই নির্দেশ করে, আকবরের সময়ের আরও অনেক আগেও বাংলা বর্ষপঞ্জির অস্তিত্ব ছিল। সপ্তম শতাব্দীর শুরুর দিকে শশাঙ্ক ছিলেন গৌড়ের রাজা ও তার রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ বাংলা বিহার অসমের একাংশ তার শাসনাধীনে ছিল ।অনুমান করা হয় শশাঙ্কের আমলে জুলিয়ান বর্ষপঞ্জির ৫৯৪ সনে বঙ্গাব্দের সূচনা হয়। তবে বঙ্গদেশে বঙ্গাব্দ কে বেশি জনপ্রিয় করে তোলেন মুর্শিদাবাদের নবাব মুর্শিদকুলি খান।

মুঘল শাসনের প্রথমদিকে দেশে হিজরী সন অনুযায়ী শাসনকার্য চলত। সম্রাটের অভিষেক থেকে শুরু করে রাজস্ব আদায় সবকিছুই হিজরী সন মেনেই হত । তবে এ ক্ষেত্রে প্রধান অসুবিধা ছিল হিজরী সন তথা পঞ্জিকা নির্ভরশীল চান্দ্রমাসের উপরে। চান্দ্রমাস অনুযায়ী এক বছর হয় ৩৫৪ দিনে। কিন্তু সৌরবছর হয় ৩৬৫ দিনে। ফলে কৃষিপ্রধান বঙ্গদেশে ঋতুর ওপর নির্ভরশীল কৃষিজ ফসল উৎপাদনের উপর থেকে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিত । এইজন্য মুঘল সম্রাট আকবর হিজরী সন কে চান্দ্র পঞ্জিকা থেকে সৌর পঞ্জিকায় রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। এরপর রাজ জ্যোতিষী ফতুল্লাহ শিবাজীর পরামর্শ অনুযায়ী ৯৬৩ হিজরী সনে নতুন বর্ষের সূচনা করেন আকবর । প্রধানত বঙ্গ দেশের জন্য এই নববর্ষের সূচনা হয় বলে এটি বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়।

বাংলা বর্ষপঞ্জি হল বঙ্গদেশের একটি ঐতিহ্য মণ্ডিত সৌর পঞ্জিকা ভিত্তিক বর্ষপঞ্জি ও পঞ্জিকা সাল । সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সৌরদিন গণনা শুরু হয় । পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে মোট ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড সময়ের প্রয়োজন হয় । এই সময়টাই এক সৌর বছর ।

গ্রেগরীয় সনের মতন বঙ্গাব্দেও মোট ১২ মাস । এগুলো হল বৈশাখ , জ্যৈষ্ঠ , আষাঢ় , শ্রাবণ , ভাদ্র , আশ্বিন , কার্তিক , অগ্রহায়ণ , পৌষ , মাঘ , ফাল্গুন ও চৈত্র । আকাশে রাশিমণ্ডলীতে সূর্যের অবস্থানের ভিত্তিতে বঙ্গাব্দের মাসের হিসাব হয়ে থাকে । জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে সৌর – মাস নির্ধারিত হয় , সূর্যের গতিপথের উপর ভিত্তি করে । সূর্যের ভিন্ন অবস্থান নির্ণয় করা হয় আকাশের অন্যান্য নক্ষত্রের বিচারে । প্রাচীন কালের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সূর্যের বার্ষিক অবস্থান অনুসারে আকাশকে ১২ টি ভাগে ভাগ করেছিলেন । এর একটি ভাগকে তারা নাম দিয়েছিলেন রাশি । আর ১২ টি রাশির সমন্বয়ে যে পূর্ণ আবর্তন চক্র সম্পন্ন হয় , তার নাম দেওয়া হয়েছে রাশিচক্র ।

এই রাশিগুলোর নাম হল- মেষ রাশি , বৃষ রাশি , মিথুন রাশি , কর্কট রাশি , সিংহ রাশি , কন্যা রাশি , তুলা রাশি , বৃশ্চিক রাশি , ধনু রাশি , মকর রাশি , কুম্ভ রাশি ও মীন রাশি । সূর্যের বার্ষিক অবস্থানের বিচারে , সূর্য কোনো না কোন রাশির ভিতরে অবস্থান করে । এই বিচারে সূর্য পরিক্রমা অনুসারে , সূর্য যখন একটি রাশি থেকে অন্য রাশিতে যায় , তখন তাকে সংক্রান্তি বলা হয় । এই বিচারে এক বছরে ১২ টি সংক্রান্তি পাওয়া যায় । একেকটি সংক্রান্তিকে একেকটি মাসের শেষ দিন হিসেবে গণ্য করা হয়। যেদিন রাত্রি ১২ টার মধ্যে সূর্য ০ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশে প্রবেশ করে তার পরদিনই ১ লা বৈশাখ ( পহেলা বৈশাখ ) হয় । যেদিন রাত্রি ১২ টার মধ্যে সংক্রান্তি হয় তার পরদিনই মাসের প্রথম দিন । মূলত একটি সংক্রান্তির পরের দিন থেকে অপর সংক্রান্ত পর্যন্ত সময়কে এক সৌর মাস বলা হয় ।

লক্ষ্য করা যায় সূর্য পরিক্রমণ অনুসারে সূর্য প্রতিটি রাশি অতিক্রম করতে একই সময় নেয় না । এক্ষেত্রে মাসভেদে সূর্যের একেকটি রাশি অতিক্রম করতে সময় লাগতে পারে , ২৯ , ৩০ , ৩১ বা ৩২ দিন । সেই কারণে প্রতি বছর বিভিন্ন মাসের দিনসংখ্যা সমান হয় না । হিন্দু পণ্ডিতগণ সূর্য , চন্দ্র এবং অন্যান্য গ্রহসমূহের ক্রমাবর্তনকে পর্যবেক্ষণ এবং হিসাব করে সময়ের হিসাব রাখার চেষ্টা করতেন ।

সূর্য সম্পর্কিত এই হিসাব নিকাশ সংস্কৃত ভাষার বিভিন্ন জ্যোতিঃশাস্ত্র বিষয়ক গ্রন্থে উঠে এসেছে , যেমন ৫ ম শতকে আর্যভট্ট কর্তৃক রচিত আর্যভট্টীয় , ৬ ষ্ঠ শতকে লটদেব কর্তৃক রচিত রোমক এবং বরাহমিহির কর্তৃক রচিত পঞ্চসিদ্ধান্তিকা , ৭ ম শতকে ব্রহ্মগুপ্ত কর্তৃক রচিত খাওখাণ্ড্যক ইত্যাদি । এই গ্রন্থগুলোতে সূর্য সহ ও বিভিন্ন গ্রহ সম্পর্কে লেখা হয় এবং এদের স্থানান্তর সম্পর্কিত হিসাব – নিকাশ এবং বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয় ।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার :- উইকিপিডিয়া

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান