কলকাতায় পেন মহোৎসব

ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান দাম সাড়ে তিন লক্ষ টাকা , পার্কার এর দাম এক লক্ষ কুড়ি হাজার টাকা।

উৎসব তো কত রকমেরই হয়। হরেক কিসিমের উৎসব পালিত হয় বাংলা জুড়ে। আর বাংলার রাজধানী কলকাতা তো উৎসব নগরী। এখানে বারোমাসই কোনো না কোনো উৎসব হয়েই থাকে । তেমনি এবার কলকাতায় পালিত হল ফাউন্টেন পেনের মহোৎসব।

একসময় কলমের দুনিয়ায় বিপ্লব ঘটে ফাউন্টেন পেন পেন এর হাত ধরে । ফাউন্টেন পেন এর আবিষ্কর্তা হলেন লুইস এডসন ওয়াটারম্যান।এই পেনের আবিষ্কার কাহিনী বেশ চমকপ্রদ। ফাউন্টেনপেন আসার আগে , সকলের মতই ওয়াটারম্যানও দোয়াত কলম ব্যবহার করতেন। তিনি একবার এক ব্যবসায়ীক চুক্তিপত্র সই করতে গিয়েছিলেন এক ব্যবসায়ীর কাছে। চুক্তিপত্র লেখা শেষ হয়েছে , এমন সময় হঠাৎ চুক্তিপত্রএর উপরে দোয়াত উল্টে পড়ে যায়। কি আর করবেন ওয়াটারম্যান ? তিনি গেলেন কালির সন্ধানে। কিন্তু ফিরে এসে দেখলেন, যে ইতিমধ্যেই আর একজন ব্যবসায়ী সই সবুদ করে চুক্তিপত্র পাকা করে চলে গেছেন। তখনই ওয়াটারম্যান প্রতিজ্ঞা করলেন এর একটা বিহিত করতেই হবে। এরপর এই ওয়াটারম্যানের হাত ধরেই জন্ম নিল ফাউন্টেন পেন।


অনেকে বলেন, ফাউন্টেন পেনের বাংলা ‘ঝর্ণা কলম’ নামটি রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। গত শতাব্দীর শেষ দশক পর্যন্তও বাঙালির মধ্যে এই কলমের ব্যাপক চাহিদা ছিল। এখন তাতে মরচে পড়েছে। শখে ছাড়া এখন কেউ ফাউন্টেন পেন খুব একটা ব্যবহার করেন না। সেই জায়গা নিয়েছে বল পয়েন্ট এবং আধুনিক জেল পেন। দামে সস্তা বলে কলমের জগতে সহজে জায়গা করে নিয়েছে ডট বা জেল পেন। পার্কার, ক্যামেল, উইলসন, উইং সাং, ক্যামলিন ইত্যাদি পরিচিত ফাউন্টেন পেন চলে গিয়েছে পিছনের সারিতে। 

কিন্তু স্মৃতি সততই মধুর। আর
পুরনো সেই দিনের কথা মনে করিয়ে দিতে কলকাতার আইসসিআর-এ আয়োজন করা হয়েছিল ঝর্ণা কলমের একটি প্রদর্শনী। যার নাম দেওয়া হয় ‘পেন মহোৎসব’। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন থেকে শুরু হয়ে তা চলল রবিবার অর্থাৎ ৩ বৈশাখ (১৭ এপ্রিল) পর্যন্ত।

সেখানেই মানুষ নেড়েচেড়ে দেখলেন ‘ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান’কে। তবে এ উদ্যান সুদূর ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান নয় । পান্না সবুজ দেহ। সোনা রঙের নকশা কাটা চকচকে খাপ। খাঁটি সোনার নিব। এ জিনিস হাতে খোদাই করে বানিয়েছেন জার্মানির শিল্পীরা। অত্যন্ত টেকসই। ভারতীয় মুদ্রায় দাম ৩ লক্ষ ৫৬ হাজার টাকা। সারা পৃথিবীতে মাত্র ৪১০ জন এর মালিক হতে পারবেন। কারণ এর পর আর এই ডিজাইনের ‘ফর্মুলা’ ব্যবহার করা যাবে না। সংক্ষেপে এই হল ‘হ্যাঙ্গিং গার্ডেন অব ব্যাবিলন’-এর ইতিহাস—যা আদতে একটি ঝর্ণা কলম বা ফাউন্টেন পেন।

তবে চমকে দেওয়ার মতো ঝর্ণা কলম আরও ছিল। পেন-প্রেমীরা দেখলেন তিন লক্ষ টাকার ‘ওয়াল্ডম্যান’। এই কলমটি মহোৎসবে এনেছে সান মার্কেটিং সংস্থা। তাদের তরফে শচীন আগরওয়াল জানান, ন’টি পেন বিদেশ থেকে আনানো হয়েছিল। তার একটি রয়েছে। তবে ওয়াল্ডম্যান কলকাতায় বিক্রি হয়নি। পাইলট কোম্পানির ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা দামের কাস্টম উরুশি ল্যাকার। দ্য পেপার প্যান সংস্থা পেনটি নিয়ে এসেছে উৎসবে। এই সংস্থার কর্ণধার রাজীব সিং জানান, তিনটি কাস্টম বিক্রি হয়েছে। যদিও এই উৎসবে ব্যাবিলন বিক্রি হয়নি। তবে এই কলম নিয়ে উৎসাহ ছিল তুঙ্গে।


উৎসবের অন্যতম উদ্যোক্তা প্রসেনজিৎ গুচ্ছাইৎ জানান, ২২টি স্টল বসেছিল এখানে। বিদেশি ও দেশীয় মিলে প্রায় হাজার পাঁচেক পেন ছিল। এখানে ৫০০ টাকা দামের কলমও যেমন ছিল, তেমনি ব্যাবিলন সহ আরও কয়েকটি বহুমূল্য পেন ছিল। প্রায় ১০ হাজার মানুষ কলম দেখতে এখানে হাজির হয়েছিলেন।


তবে পেন মহোৎসব নতুন নয় । দেশের অন্যান্য শহরে এই উৎসব নিয়মিত হয়। তবে কলকাতায় শুধু ঝর্ণা কলম নিয়ে এরকম প্রদর্শনী আগে হয়নি। মুম্বইয়ের হীরেন ও ক্রনাল কনকহারা এসেছিলেন হনুমান, গণেশ, সাঁইবাবার মূর্তি খোদাই করা পেন নিয়ে। তাঁরা জানান, পেনগুলির দাম ২৫ থেকে ৯৯ হাজার টাকার মধ্যে। মহারাষ্ট্র, পুনে চেন্নাই, অমৃতসর ইত্যাদি জায়গায় এগুলির বিক্রি ভাল। তবে কলকাতায় একটাও বিক্রি হয়নি। তবে সব মিলিয়ে পেন মহোৎসব ঘিরে কলকাতার শৌখিন নাগরিকদের মধ্যে লক্ষ্যণীয় উৎসাহ দেখা গিয়েছে বলে দাবি উদ্যোক্তাদের।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান