ইংরেজ আমলে ইউরোপীয়দের হাত ধরে কলকাতা কেন্দ্রিক যে বিপুল ব্যবসা ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল তাতে বাঙালির অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য ।তবে আজ ভারতীয় শেয়ার বাজারের বেশ খানিকটা অংশ বাঙালি শেয়ারহোল্ডারদের হাতে।
বাঙালি সম্পর্কে একটা কথা অত্যন্ত প্রচলিত যে বাঙালি ঝুঁকি নিতে ভয় পায়। অন্যান্য ক্ষেত্রে এই কথাটি প্রযোজ্য না হলেও ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কথাটির যথেষ্ট যৌক্তিকতা আছে । ইংরেজ আমলে বাংলাতেই তৈরি হয়েছিল ভারতের প্রথম বণিকসভা – “বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্স”(bengal chembar of commarce)। তবে বাংলাতে বণিক সভা গঠিত হলেও তাতে বাঙালি শামিল হয় নি। মধ্যবিত্ত বাঙালি ইংরেজ কোম্পানির অধীনে একটি চাকরি জুটিয়ে সুখের জীবন যাপন করাটাই লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছিল।

বাঙালি একদম যে ব্যবসার দিকে পা মাড়ায়নি এমন নয় । তবে তার তালিকা অন্যান্য জাতির তুলনায় অনেক ছোট। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর , আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় , গৌড় মোহন দত্ত , স্যার বীরেন্দ্র নাথ মুখোপাধ্যায় এর মত সামান্য কয়েকজন বাঙালি ইংরেজ আমলে নিজেদের সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন। প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ‘বেঙ্গল কেমিক্যালস’ (Bengal Chemicals and farmacutical ) এর হাত ধরে অনেক ভারতীয় তাদের কর্ম জীবন অতিবাহিত করেছেন বা করছেন । কিন্তু ব্যবসা বিমুখ বাঙালি ব্যবসার তুলনায় সরকারী বা বেসরকারী চাকরীতেই অধিক গুরুত্ব দিয়ে এসেছে।
ব্যবসার মতো বিনিয়োগের দুনিয়াতেও বাঙালি কখনো এগিয়ে এসে খেলেনি। কিন্তু কলকাতা কে কেন্দ্র করে প্রথম প্রজন্মের ব্যবসা স্থাপনের সুবাদে , ব্রিটিশ শাসিত ভারতে কলকাতাতেই স্থাপিত হয় ভারতের এমনকি এশিয়ার প্রথম শেয়ারবাজার । ১৮৬৩ সালে “দ্য ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জ” কাজ শুরু করে ।প্রথমদিকে ব্যবসার প্রতি নেতিবাচক মানসিকতার কারণে বাঙালি এ নিয়ে খুব একটা আগ্রহ না দেখানোয় প্রথম থেকেই শেয়ার বাজারের দখল চলে গিয়েছিল ভিন রাজ্যের মানুষজনের কাছে।
উনিশ শতকে সাহেব কোম্পানির সঙ্গে কাজের সুবাদে অনেক সময় কোম্পানির বাঙালি কর্মচারীরা কিছু শেয়ার কিনতে পারত । তবে অন্যান্য রাজ্যের মানুষজনের তুলনায় তা নিতান্তই কম । বিভিন্ন বাংলা সাহিত্যে ‘কোম্পানির কাগজ’ কথাটি বহুবার আলোচিত হয়েছে । এই কোম্পানির কাগজ যে আসলে শেয়ার সার্টিফিকেট তাতে কোন সন্দেহ নেই।
ব্রিটিশ কোম্পানিগুলির ব্যবসার আকার যত বাড়ছিল , ততো বড়ো আকারের পুঁজির দরকার পড়ছিল। একজন ব্যক্তির পক্ষে এই পুঁজি জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না । এ কারণেই যৌথ পুঁজির ভাবনা আসে। আর এই ভাবনা থেকেই তৈরি হয়েছিল জয়েন্ট স্টক কোম্পানি। কোম্পানির আমলে কলকাতায ছিল ইউরোপীয় সাহেবদের প্রধান কর্মক্ষেত্র । কিন্তু সেই সময়ে ভারতে কোন কোম্পানি আইন ছিল না বলে স্টক কোম্পানিগুলির নথিভুক্তিকরণ হত ইংল্যান্ডে।
ভারতের প্রথম কোম্পানি আইন আসে ১৯১৩ সালে । তবে এর অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন কোম্পানি তৈরি হয়েছিল । দ্য বিশনওথ টি কোম্পানি লিমিটেড নামে একটি চা কোম্পানি ইংল্যান্ডে নথিভুক্ত হয় 1863 সালে। সি ই এস সি (CESC) কোম্পানিটি তৈরি হয় উনিশ শতকের শেষভাগে। এ ছাড়াও সমকালীন সময়ে তৈরি অন্যান্য ভারতীয় কোম্পানী গুলির মধ্যে ছিল শালিমার পেইন্টস , আইটিসি , বিড়লা কর্পস প্রভৃতি।
বর্তমান ভারতীয় স্টেট ব্যাংক এর জন্ম ১৯২১ সালে। তখন এর নাম ছিল ইম্পেরিয়াল ব্যাংক। ফিলিপস ইন্ডিয়া , বাটা ইন্ডিয়া , ইউনিয়ন কার্বাইড সহ বহু কোম্পানি ভারতের স্বাধীনতার বহু আগেই তৈরি হয়েছিল বাংলায়, নির্দিষ্ট ভাবে বলতে গেলে কলকাতায়।

ব্যবসা কিংবা বিনিয়োগ ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভাল সুযোগ বাংলায় তৈরি হয়েছিল । তবে বাঙালি সেই সুযোগ সর্বতোভাবে গ্রহণ করেনি বা করার চেষ্টা করেনি । এর পেছনে ঝুঁকি অবশ্যই একটা কারণ , কিন্তু আরো কয়েকটি কারণ ছিল । এই সময় বাংলার বেশিরভাগ মানুষ যুক্ত ছিল কৃষি কাজের সঙ্গে কিংবা স্থানীয় ভাবে ছোট ব্যবসা , মহাজনী কারবার এর সঙ্গে। বৃহৎ ব্যবসার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল না।
উনিশ শতকের শুরু থেকেই বাংলা জুড়ে শুরু হয়েছিল সমাজ সংস্কার আন্দোলন । স্বামী বিবেকানন্দ , ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর , রামমোহন রায় , হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও , দ্বারকানাথ ঠাকুর , উয়িলিয়াম কেরি , রানী রাসমণি প্রমূখ মানুষদের আদর্শে সাধারণ মানুষ যথেষ্ট প্রভাবিত হয়েছিল । এছাড়াও বাঙালি ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিল , ফলে বাঙালি মননে সেই ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গেই ব্যবসা কিংবা বিনিয়োগ বিশেষভাবে স্থান পায়নি।
তবে বর্তমানে ক্রমশই অবস্থা বদলাচ্ছে। বাঙালি সন্তানেরা আজ চাকরির পাশাপাশি ব্যবসাতেও যথেষ্ট আগ্রহী হয়ে উঠেছে । এখন অনেক বেশি সংখ্যায় বাঙালি শেয়ার বাজারে লগ্নি করছে। মুম্বাই শেয়ার বাজারে বর্তমানে প্রায় ১০.৩৮ কোটি লগ্নিকারীর মধ্যে ৫৫ লক্ষ এ রাজ্যের বাঙালি । গত এক বছরে পশ্চিমবঙ্গ থেকে লগ্নিকারীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ এই পরিসংখ্যান বলছে , আজ বাঙালি আর ঝুঁকি নিতে ভয় পায় না । সব বাধা অতিক্রম করে বাঙালি আজ অন্যান্যদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যবসাক্ষেত্রে ছুটে চলেছে।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার : আনন্দবাজার পত্রিকা

One thought on “বাঙালির ব্যবসা”