আজ ২৫ শে বৈশাখ। কবিগুরু এবছর পা দিলেন ১৬১ বছরে। আজকের পর্বে জেনে নেওয়া যাক রবির ছোটবেলার লেখাপড়া সম্পর্কে এমনকি ছোটবেলাতেই শিক্ষকও হয়ে উঠেছিল। দশ বছর বয়সী শিক্ষক রবির ছাত্র ছিল কারা?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্কুলে যাওয়ার সূচনাপর্ব বেশ মজার । একদিন তার দাদা এবং তার বড়ভাগ্নে সত্য স্কুলে যাওয়ার সময় তিনি তাদের সঙ্গে স্কুলে যাবেন বলে কান্না জুড়লেন । কিন্তু সেই সময় তাঁর বিদ্যালয় যাওয়ার বয়স হয়নি। তবে কেবলমাত্র পড়াশোনার মোহেই তার বিদ্যালয় যাত্রার ইচ্ছে, এমন নয় । এর আগে সে কোনদিন গাড়ি চড়েনি কিংবা বাড়ির বাইরেও বের হয় নি। আর ইতিমধ্যে তার ভাগ্নে সত্য , স্কুল যাওয়ার পথের ভ্রমণ বৃত্তান্ত অতিরঞ্জন করে বালক রবিকে শুনিয়ে ছিল। তারপরই স্কুল এ যাওয়ার জন্য রবির কান্নাকাটি।

কিন্তু তার সেই বিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছেকে সংবরণ করতে হয় বাড়ির শিক্ষকের চপেটাঘাতে। সেই শিক্ষক তাকে বলেছিলেন, “এখন স্কুলে যাওয়ার জন্য যেমন কাঁদিতেছ না যাওয়ার জন্য ইহার চেয়ে অনেক বেশি কাঁদিতে হইবে” ।তবে ‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ সেই শিক্ষকের পরিচয় মনে করতে পারেননি।
এরপর একসময় রবিকে ওরিয়েন্টাল সেমিনারি তে ভর্তি করা হল। সেখানে আবার পড়া না বলতে পারলে এক আশ্চর্য শাস্তির ব্যবস্থা ছিল। পড়া না পারা ছেলেটিকে বেঞ্চে দাঁড় করিয়ে তার দুই প্রসারিত হাতের উপরে ক্লাসের অনেকগুলি স্লেট একসঙ্গে করে চাপিয়ে দেওয়া হতো।ঠাকুরবাড়ির সকল ছেলে মেয়ে শিশুকালে কঠোর নিয়ম নীতির মধ্যে বড় হতো । তাদের ছোটোবেলায় ভোগ-বিলাসের তেমন কোনো আয়োজন ছিল না । তারা প্রত্যেকেই থাকত চাকরদের অধীনে । পিতা-মাতার সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ও ছিল বাধা । তাদের পোশাক এতটাই যৎসামান্য ছিল , যে বর্তমান দিনে তা হয়তো অসম্মানের কারণ হতে পারে ।
রবীন্দ্রনাথ ১০ বছর বয়স পার হওয়ার আগে কোনদিন মোজা পড়ে নি। শীতকালে একটা সাদা জামার ওপরে আর একটা সাদা জামাই যথেষ্ট ছিল। তাদের বাড়ির দর্জি ছিলেন নোয়ামত খলিফা। তিনি ছোটদের জামার সাধারণত পকেট তৈরি করতেন না । তাতে বালক রবি যথেষ্ট দুঃখ হত কারণ ছোটদের যা কিছু সম্পত্তি তার সবকিছুই জামার পকেটে থাকত। তাই নোয়ামত খলিফার কাছে জামায় পকেট করে দেওয়ার জন্য আবদার জুড়ত রবি।
ঠাকুরবাড়িতে রবির দেখাশোনার জন্য শ্যাম নামের এক চাকর ছিল । সে রবিকে ঘরের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বসিয়ে তার চারদিকে খড়ি দিয়ে গণ্ডি কেটে দিত এবং ভীতিজনক কন্ঠে তর্জনী তুলে রবি কে সাবধান করত এই বলে যে, সেই গণ্ডির বাইরে গেলেই ভীষণ বিপদ। এর আগে রবি রামায়ণে গণ্ডি পার হওয়ার কারণে সীতার কি বিপদ হয়েছিল তা পাঠ করেছিল ।ফলে শ্যামের আঁকা গন্ডিটিকে নিছক অবিশ্বাসীর মত উড়িয়ে দিতে পারত না রবি।
পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রায়ই নানা স্থানে ভ্রমণে চলে যেতেন ।বাড়িতে বিশেষ থাকতেন না।তখন তার তিন তলার ঘর বন্ধই থাকত। সেই ফাঁকে বালক রবি খড়খড়ি খুলে হাত দিয়ে ছিটকিনি টেনে দরজা খুলে ফেলত । সেই ঘরের আরো একটা আকর্ষণ ছিলো , তখন শহরে সবেমাত্র জলের কল হয়েছে । সেই তেতালার স্নানের ঘরেও তার প্রবেশ হয়েছিল । পিতার অবর্তমানে বালক রবি কলঘরের ঝাজরি খুলে মনের সুখে স্নান করে বিছানার চাদর দিয়ে গা মুছে শান্ত হয়ে সোফায় বসে থাকত। আবার ঠাকুরবাড়ির সেই ছাদে তীব্র রোদের আঁচে ফুটতে থাকা পরিবেশে সেই কলঘরটিকে ওয়েসিস হিসেবে আবিষ্কার করে নিজেকে শিশু লিভিংস্টোন বলেছিলেন তিনি।

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে মাঘোৎসব হত । এইজন্য উঠোনের চারদিক কাঠের থাম পুঁতে তার ওপরে ঝাড়লন্ঠন টাঙানো হত ।থাম পোঁতার জন্য যে গর্ত করা হতো । মাটিতে করা এইসব গর্তের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল রবির । কারন সে মনে করত , মাটির নিচে কোন এক সুরঙ্গপথে কোন রাজপুত্রের দেখা মিলবে । কিন্তু এক মানুষ সমান মাটিকাটা হলেও সেখানে তার কল্পনা শক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য পুর্ণ কিছুই দেখতে না পেয়ে হতাশ হত রবি।
‘জীবনস্মৃতি’ তে শাসনকর্তার রূপে ঈশ্বর নামে একজনের কথা উল্লেখ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। ঈশ্বর ঠাকুরবাড়িতে আসার আগে গ্রামে গুরুমশাইগিরি করত । সে ছিল অত্যন্ত শুচিগ্রস্ত ও আচারনিষ্ঠ গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ । তার স্নানের পদ্ধতি ছিল বেশ মজার । স্নানের সময় সে পুকুরের তিন থেকে চার হাত নিচের জল ঘটিতে সংগ্রহ করে তারপর সেই জল মাথায় ঢালতো। আবার অনেক সময় সে দুই হাত দিয়ে পুকুরের উপরিতলের জল কাটিয়ে হঠাৎ করে এক সময় ডুব দিত। যেন পুকুরকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা।
ঠাকুর বাড়ির দোতলার বারান্দার একটা বিশেষ কোনে রবীন্দ্রনাথ বারান্দার রেলিং গুলোকে তার ছাত্র সাজিয়ে স্কুল খুলেছিলেন । একটা লাঠি হাতে নিয়ে রেলিং গুলো পড়াত রবি। এগুলোর মধ্যে কোনটা ভাল আর কোনটা মন্দ তা তিনি নিজেই ঠিক করে নিয়েছিলেন। তাই যেগুলো মন্দ রেলিঙ তাদের উপর অনবরত লাঠির বাড়ি পড়ত। কোন ধরনের শাস্তি দিলে সেই রেলিং গুলো তার কথা শুনে চলবে, সেটা ভেবে রবির ঘুম হত না।
নর্মাল স্কুলের একটি ঘটনা ঘটেছিল । স্কুলে বছর শেষে যখন বাৎসরিক পরীক্ষা হল তখন রবি বাংলায় সকলের থেকে বেশি নম্বর পেলেন। বাংলার শিক্ষক ছিলেন মধুসূদন বাচস্পতি। তিনি রবি কে অত্যন্ত স্নেহ করতেন । বাংলা পরীক্ষায় সকলের থেকে বেশি নম্বর পেল রবি।কিন্তু ক্লাসের শিক্ষক স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ করলেন যে , পরীক্ষক নাকি রবির প্রতি পক্ষপাত করেছেন। ফলে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হলো । এবারে স্বয়ং সুপারিনটেনডেন্ট রবির পাশে বসে থাকলেন। কিন্তু এবারেও রবি প্রথম হল।

নর্মাল স্কুলের শিক্ষক শ্রীযুক্ত নীলকমল ঘোষাল ঠাকুরবাড়িতে রবি এবং তার অন্যান্য ভাই দের পড়াতে আসতেন। সকাল ৬ টা থেকে সাড়ে নটা পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ চলত। রবি এবং তাঁর অন্যান্য ভাই দের নানান বিচিত্র বিষয়ে শিক্ষা দেওয়ায় বিশেষ উৎসাহ ছিল রবির সেজ দাদার ।সেইজন্য স্কুলের যতটুকু পড়া ছিল তার থেকেও অনেক বেশি পড়তে হতো। ভোরবেলা অন্ধকার থাকতে ঘুম থেকে উঠে একটি লেংটি পড়ে প্রথমে এক কানা পালোয়ান এর সঙ্গে কুস্তি করতে হত। তারপর সেই মাটি-মাখা শরীরের ওপর জামা পড়ে পদার্থবিদ্যা, জ্যামিতি , গণিত, ইতিহাস , ভূগোল , মেঘনাদবধ কাব্য এর স্বাদ গ্রহণ করতে হত। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরলেই ড্রইং এবং জিমন্যাস্টিকসের মাস্টার এসে হাজির হতেন। সন্ধ্যার সময় ইংরেজি পড়াতে আসতেন আঘোর বাবু। এভাবে সারাদিন পড়াশোনার পরে রাত্রি নটার সময় রবির ছুটি হত সেই দিনটির মত।
তথ্য ঋণ – জীবন স্মৃতি , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ; জীবনের ঝরাপাতা, সরলা দেবী চৌধুরানী
