বঙ্গদেশের রঙ্গমঞ্চ

তারপর হঠাৎ শুনলাম , ছবি কথা কইছে । টকিতে গেলুম। কিন্তু মানুষ কয় বলে তো মনে হলো না, এই যেমন আমরা কথা কই।

ভারতের প্রথম সিনেমা প্রদর্শিত হয় লুমিমের ব্রাদার্স এর দ্বারা ফ্রান্সে প্রথম সিনেমা প্রদর্শনের মাত্র ছয় মাস পরে ১৮৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসে। সেই সময়ই কলকাতাতেও চলে গেল সিনেমা । প্রথমদিকে বিদেশি কোম্পানির হাত ধরে বাংলায় এল বায়োস্কোপ’ । তবে সিনেমার জন্ম লগ্ন থেকেই বাঙালি যুক্ত হয়েছে এর সঙ্গে।

প্রথম মুভি ক্যামেরা

জাদুঘরের জাদু ইতিহাসে নজর

হীরালাল সেন

১৮৯৮ সালে হীরালাল সেন এবং তার ভাই মতিলাল সেন তৈরি করলেন রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানি । ১৯০২ সালে কলকাতায় প্রথম মুভি ক্যামেরা এল । সেই সময়কার বিভিন্ন জনপ্রিয় নাটক যেমন আলিবাবা, সরলা, সীতারাম, ভ্রমর থেকে বিভিন্ন ছোট ছোট দৃশ্য নিয়ে তারা ছায়াছবি তৈরি করলেন। কিন্তু ১৯১৩ সাল নাগাদ দুই ভাইয়ের মধ্যে বিবাদের জেরে রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানি বন্ধ হয়ে যায়।

জে এফ ম্যাডান

সেই অর্থে বাণিজ্যিকভাবে বাংলা সিনেমা দেখানো শুরু হয় জে এফ ম্যাডান নামে এক ব্যবসায়ীর উদ্যোগে । ১৯০৪ সালে তিনি তৈরি করলেন ম্যাডান থিয়েটার লিমিটেড । প্রথমে তারা ইংরেজি ছবি দেখালেও ১৯১৩ সাল থেকে বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় সিনেমা দেখানো শুরু করে। এভাবেই ১৯১৯ সালে ম্যাডান কোম্পানির প্রযোজনায় প্রথম বাংলা কাহিনীচিত্র ‘বিল্বমঙ্গল’ তৈরি হয় । এরপর একে একে বিষবৃক্ষ, প্রফুল্ল ,শিবরাত্রি ,জনা, নল দময়ন্তী ,মহাভারত, নৌকাডুবি, ইন্দিরা সহ মোট ৬২ টি ছবি ম্যাডান প্রযোজনা করে।

ম্যাডান থিয়েটার , কলকাতা

প্রথম বাংলা সবাক সিনেমার জন্মও ম্যাডানে র হাত ধরে। ১৯৩১ সালের ১১ ই এপ্রিল প্রথম বাংলা সবাক সিনেমা ‘জামাই ষষ্ঠী’ মুক্তি পায়। তবে সিনেমার চরিত্র গুলোর কথা বলা বিষয়টি সাধারণ মানুষের চোখে যথেষ্ট আশ্চর্যের ছিল। এ বিষয়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন , “—পর্দার উপর ছবি নড়তে-চড়তে লাগলো, আশ্চর্য। সিনেমা আমি দেখেছি ,অনেকদিন ধরে দেখেছি । … সিনেমায় গিয়ে বসে থাকতুম– তাদের নড়াচড়া দেখে ভাব বুঝতুম। যেমন রাস্তায় কত লোক চলে যায় , কেউ হাত দুলিয়ে যায় , কেউ পা নাড়িয়ে যায় , কারোর সঙ্গে কথা নেই, মনের যোগ নেই , তবু তাদের হাত-পা নাড়া দেখে তাদের মনের ভাব বুঝি। হঠাৎ শুনলাম ছবি কথা কইছে । … টকি তে গেলুম। কিন্তু মানুষ কয় বলে তো মনে হলো না, এই যেমন আমরা কথা কই । মনে হল, যেন তাদের হয়ে আর কেউ কথা কইছে ,গ্রামাফোন বা অন্য কিছু।”

সবাক সিনেমা সম্পর্কে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এ ধরনের উক্তি থেকে বোঝা যায় সিনেমায় ছবি ও শব্দের সামঞ্জস্য তখনও যথেষ্ঠ স্বাভাবিক হয়নি। সিনেমাকে আরো স্বাভাবিক প্রাণবন্ত এবং জীবনের কাছাকাছি আনার কাজটা শুরু করেছিলেন বিদেশ থেকে লেখাপড়া শিখে আসা ইঞ্জিনিয়ার বীরেন্দ্রনাথ সরকার ও তার নিউ থিয়েটার্স কোম্পানি । আমেরিকা থেকে দক্ষ কারিগর এনে এবং বিদেশের জ্ঞান প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তার কোম্পানির কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলেন। এই সময়ে ম্যাডান কোম্পানি বন্ধ হয়ে যায় । যার জায়গা দখল করে নিউ থিয়েটার্স কোম্পানি। বাংলা সিনেমার পরবর্তী কয়েক দশকে নিউ থিয়েটার্স এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এই কোম্পানির মূলমন্ত্র ছিল- জীবতাং জ্যোতিরেতু ছায়াম (জীবনের সাথে আলোকিত ছায়া)।

নিউ থিয়েটার্স এর লোগো

নিউ থিয়েটার্স এর প্রথম থেকেই ধীরেন্দ্রনাথ সরকার বিভিন্ন জ্ঞানীগুণী মানুষ কে নিয়ে এসেছিলেন ।পরিচালক ছিলেন দেবী কুমার বসু এবং প্রমথেশ বড়ুয়া মত মানুষ। ক্যামেরা ও শব্দ প্রকৌশলী ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের দুই কাকা নীতিন বসু ও মুকুল বসু। এছাড়াও নিউ থিয়েটার্স এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্রখ্যাত সঙ্গীতকার যেমন রাইচাঁদ বড়াল , কৃষ্ণচন্দ্র দে, পঙ্কজ মল্লিক, শচীন দেব বর্মন ,কমল দাশগুপ্ত, অজয় ভট্টাচার্য প্রমুখ । নিউ থিয়েটার্সই প্রথম বাংলা ও হিন্দিতে দ্বিভাষীক সিনেমা বানানো শুরু করে।

বি এন সরকার

নিউ থিয়েটার্স এর হাত ধরে মুক্তি পায় চন্ডীদাস, পুরান ভগৎ, বিদ্যাপতি ,দেনাপাওনা, কপালকুণ্ডলা, দেবদাস, মুক্তি ,নটীর পূজা, পুনর্জন্ম, চিরকুমার সভা, মাস্তুতো ভাই, সীতা, নর্তকী, জীবন মরণ ,সাপুড়ে ,বড়দিদি, দুশমন, অধিকার ,সাথী ,অচিন প্রিয়া প্রভৃতি

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান