Human computer শকুন্তলা দেবীর অন্য দিক : ‘The World of Homosexuality’

#Human computer Shakuntala Devi : মানব কম্পিউটার শকুন্তলা দেবী যেমন নিমেষের মধ্যে বড় বড় অঙ্কের নির্ভুল সমাধান করেছেন , তেমনি ৪৫ বছর আগে ভারতে সমকামিতা নিয়ে প্রথম বই লিখে আলোড়নও ফেলে দিয়েছিলেন। মাত্র দু’বছর আগে তিনি পেলেন গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে মরণোত্তর শংসাপত্র । ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে লোকসভা নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন শকুন্তলা দেবী।

৭৬৮৬৩৬৯৭৭৪৮৭০×২৪৫৬০৯৮৭৬৫৪৩২৫৬৭ = কত ? এই গুনটির উত্তর বের করতে আপনার কতক্ষণ সময় লাগতে পারে ?এই সময় ও শ্রম বাঁচাতে আপনি হয়তো ক্যালকুলেটরের সাহায্য নেবেন। কিন্তু মাত্র ২৮ সেকেন্ডে এর উত্তর নির্ণয় করেছিলেন মানব কম্পিউটার শকুন্তলা দেবী (Shakuntala Devi)

মাত্র 28 সেকেন্ড সম্পূর্ণ করেন এই গগনা

হ্যাঁ, মাত্র ২৮ সেকেন্ড সময়ের মধ্যেই খাতা পেন অথবা কোনো ক্যালকুলেটর এর সাহায্য ছাড়াই সঠিক উত্তর দিয়ে ‘গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ‘(Guinness Book of World Record) এ নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে দিয়েছিলেন এই ভারতীয় নারী। তবে ১৮ জুন ১৯৮০  ইম্পেরিয়াল কলেজ, লন্ডন  (Imperial college, London) এ শকুন্তলা দেবী তার বিশ্ব রেকর্ড অর্জন করলেও, রেকর্ডের শংসাপত্রটি দেওয়া হয়েছে মাত্র দুই বছর আগে, ৩০ জুলাই ২০২০ তারিখে শকুন্তলা দেবীর মৃত্যুর  সাত বছর পরে।

শকুন্তলা দেবীর গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ড এর শংসাপত্র

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে ৪ ঠা নভেম্বর বর্তমান ব্যাঙ্গালোরের (Bengaluru )এক কন্নড় ব্রাহ্মণ পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন । তার বাবা সিভি সুন্দর রাজন (C V Sundar Rajan Rao) ছিলেন সার্কাসের ট্রাপিজ শিল্পী ।মাত্র তিন বছর বয়সেই বাবা সুন্দর রাজন রাও এর কাছে শকুন্তলা দেবীর অদ্ভুত গণনায় শক্তির প্রকাশ। মাত্র ৬ বছর বয়সে ইউনিভার্সিটি অফ মাইসোর (University of Mysore) এ শকুন্তলা দেবী তাঁর আশ্চর্য গণনা ক্ষমতার নিদর্শন দেন । খুব শীঘ্রই এই খবর ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে ।

১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাবার সাথে পাড়ি দেন লণ্ডন( London)। তখন থেকেই বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ ঘুরে চলতে থাকে তাঁর এই অসামান্য গণনা ক্ষমতার প্রদর্শন । বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া (University Of California)য় কর্মরত এডুকেশানাল সাইকোলজি (educational psychology) র প্রফেসর আর্থার জেনসন (Arthur Jensen ) আগ্রহী হন এবং শকুন্তলা দেবীকে আমন্ত্রণ জানান ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ায় তাঁর এই বিশেষ প্রতিভা প্রদর্শনের জন্য । তার ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে শকুন্তলা দেবী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রওনা দেন ।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁকে ৬১৬২৯৮৭৫ -এর ঘনমূল এবং ১৭০৮৫৯৩৭৫ – এর ৭ ম মূল বের করতে দেওয়া হয় এবং বিস্ময়করভাবেই দুটি অঙ্ক জেনসন কাগজ-কলমে শেষ করার আগেই শকুন্তলা দেবী সঠিক উত্তর জানিয়ে দেন । ইন্টেলিজেন্স জার্নালে ১৯৯০ সালে জেনসন শকুন্তলা দেবীর এই বিস্ময়কর প্রতিভার কথা তুলে ধরেন ।

আরো দেখুন সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ সরে আসছে হাওড়ার দিকে , আশঙ্কিত বিজ্ঞানীরা

১৯৭৭ সালে টেক্সাস এর সাউদার্ন মেথডিস্ট ইউনিভার্সিটি (Southern Methodist University) -তে শকুন্তলা দেবীকে একটা ২০১ অঙ্কের একটি সংখ্যার ২৩ – তম বর্গমূল ( Root) নির্ণয় করতে দেওয়া হয় । এই সমগ্র বিষয়টি পরিচালনা করার জন্য US Bureau of Standard -এ তখনকার সেরা কম্পিউটারে একটি বিশেষ প্রোগ্রামিং তৈরি করা হয় , যার মাধ্যমে একই সমস্যা সমাধান করে জানিয়ে দেওয়া যাবে । কিন্তু বিস্ময়করভাবে কম্পিউটারের থেকেও কম সময়ে শকুন্তলা দেবী তার গণনা শক্তির সাহায্যে জানিয়ে দেন সঠিক উত্তর।

১৮ জুন ১৯৮০ তারিখে তিনি দুটি ১৩ অঙ্কের সংখ্যার গুন প্রদর্শন করেছিলেন যেটি বিশ্বরেকর্ড হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৩ অঙ্কের সংখ্যা দুটি ছিল ৭,৬৮৬,৩৬৯,৭৭৪,৮৭০ × ২,৪৬৫,০৯৯,৭৪৫,৭৭৯ ; মাত্র ২৮ সেকেন্ড সময়ে তিনি এর নির্ভুল উত্তর নির্ণয় করেন। যেটি ছিল ১৮,৯৪৭,৬৬৮,১৭৭,৯৯৫,৪২৬,৪৬২,৭৭৩,৭৩০ ;  এই ঘটনাটি ১৯৮২ সালের গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে ( Guinness Book of World Record) এ স্থান পায়। তাকে ভূষিত করা হয় ‘মানব কম্পিউটার’ (Human Computer) অভিধায়। যদিও শকুন্তলা দেবীর এই নামটি একেবারেই অপছন্দের । তাঁর মতে , যেকোনো মানুষের মন অসীম ক্ষমতার অধিকারী । শুধুমাত্র মনের শক্তিতেই একজন মানুষ সব অসম্ভবকেই সম্ভব করতে পারে । তাই একজন মানুষের ক্ষমতাকে একটি মেশিনের সাথে তুলনা করা একেবারেই অর্থহীন ।

আরো দেখুন দূরসম্পর্কের বোন বিজয়া হয়ে উঠেছিলেন সত্যজিৎ জায়া

অবশ্য এই যে human computer বা মানব গণক হওয়ার পাশাপাশি শকুন্তলা দেবী ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অত্যন্ত আধুনিক এক নারী। তৎকালীন সমাজের বেড়াজাল ভেঙে ফেলে একজন স্বাধীনচেতা নারীর জীবন বেছে নেওয়া , সর্বোপরি স্বাধীন ভাবনা ভাবতে পারা এবং সেই ভাবনা মানুষের মধ্যে পৌঁছে দেওয়া ছিল তাঁর আরও একটি উল্লেখযোগ্য গুণ ।

শকুন্তলা দেবী লিখিত সমকামিতা বিষয়ক বই

লেখিকা শকুন্তলা দেবী একেবারেই অন্যরকম মানুষ । ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত হয় সমকামিতা বিষয়ক তাঁর প্রথম একাডেমিক স্টাডি ‘ The World of Homosexuality ‘ । ভারতবর্ষে সেই সময় সমকামিতা নিয়ে প্রায় কোনোরকম ধারণা ছিল না বললেই চলে । শকুন্তলা দেবী এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করে যান । তবে এজন্য তিনি যথেষ্ট সমালোচিতও হয়েছিলেন । এই বিষয়ে কাজের ক্ষেত্রে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের প্রভাব উল্লেখযোগ্য । ১৯৬০ সালে তিনি বিবাহ করেছিলেন পরিতোষ ব্যানার্জিকে । যদিও ১৯৭৯ সালে সেই বিয়ে ভেঙে যায় , বিভিন্ন ব্যক্তিগত কারণে । শোনা যায় সমকামী পুরুষের সাথে সংসার করতে গিয়ে এই বিষয়ে তাঁর ভাবনা এবং দৃষ্টিভঙ্গির বিশেষ উত্তরণ ঘটে।

শকুন্তলা দেবী ১৯৮০ সালে নির্দল প্রার্থী হিসেবে লোকসভা নির্বাচন (Loksobha election) এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। অন্ধ্রপ্রদেশ (Andhara pradesh) এর মেদাক থেকে তিনি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী (Indira Gandhi) র বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছিলেন । ৬৫১৪ ভোট পেয়ে তিনি নবম স্থানে ছিলেন।

মানব কম্পিউটার হিসেবে কাজ করা ছাড়াও তিনি পেশাগতভাবে একজন জ্যোতিষীও ছিলেন এবং জ্যোতিষশাস্ত্রের উপরে বেশ কয়েকটি বইও তিনি রচনা করেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘Astrology for You ‘।এছাড়া তাঁর লেখা অন্যান্য বই গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য  ‘ The joy of Numbers’ , ‘In the Wonderland of Numbers ‘ , ‘More Puzzles to Puzzle You‘ , ‘Super Memory: It Can Be Yours

শকুন্তলা দেবী লিখিত বিভিন্ন বইয়ের প্রচ্ছদ

২০১৩ সালে ব্যাঙ্গালোর হাসপাতালে শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যা নিয়ে তিনি ভর্তি হন এবং ২১ এপ্রিল হার্ট ও কিডনি সমস্যার কারণে ৮৩ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেন এই মহান ভারতীয় প্রতিভাময়ী নারী ।

২০১৩ সালে তাঁর ৮৪ তম জন্মদিবসে গুগল ডুডলস তৈরীর মাধ্যমে তাঁকে সম্মান জ্ঞাপন করে। ২০১৯ সালে শকুন্তলা দেবীর জীবনের উপর আধারিত একটি হিন্দি সিনেমাও মুক্তি পেয়েছিল।

চিত্র – সংগৃহিত

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান