এদেশের প্রথম আধুনিক মানুষ তিনি, নবজাগরণের প্রাণপুরুষও তিনি । নারীদের সতীপ্রথার কবল থেকে তিনি মুক্ত করেছেন । আবার তিনিই সাগর পেরিয়ে ইংল্যান্ডে দাসপ্রথার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। এই মানুষটি রাজারামমোহন রায়। এ বছর তার জন্মের আড়াইশো বছর পূর্ণ হল।

১৮৩৩ সালে ওয়াশিংটনে দাস প্রথা বিলোপের ইশতেহারে বলা হয় , আমরা একজনের নাম করতে চাই যিনি এ যুগের সবচেয়ে আলোচিত ও হিতৈষী ব্যক্তিত্ব … তিনি রামমোহন রায়।
উনিশ শতকের প্রথম দিকে রামমোহন রায় (Rammohon Ray) এর খ্যাতি ভারত ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়ে। শুধু ইংল্যান্ড নয় আমেরিকাতেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিচিত ব্যক্তি। উনিশ শতকে যেখানে যোগাযোগব্যবস্থার এত বাহুলতা ছিল না, সেখানে ভারত থেকে সুদূর ইউরোপ-আমেরিকায় কিভাবে তার নাম ছড়িয়ে পড়লো , তা গবেষণার বিষয় । ওবার্লিন কলেজের শিক্ষক মাইকেল ফিশার ( Micle Fishar) গবেষণায় দেখিয়েছেন , ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেওয়ার পর আমেরিকা নিজ উদ্যোগে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যের প্রস্তুতি নেয়। তখন থেকেই আমেরিকান জাহাজ বাণিজ্য করতে কলকাতায় যাওয়া আসা করত। বাণিজ্য করে ফেরার পথে তারা রামমোহন রায়ের লেখার ইংরেজি অনুবাদ সঙ্গে করে নিয়ে যেত। সুতরাং মার্কিন অধিবাসীদের কাছে রামমোহন পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। রামমোহন রায় যখন ইংল্যান্ডের ছিলেন তখন প্রখ্যাত আমেরিকান শিল্পী রেমব্রান্ট পিল (Rembrandt Pill) নিজে আমেরিকা থেকে সাগর পেরিয়ে ইংল্যান্ডে আসেন রামমোহন রায়ের প্রতিকৃতি আঁকার জন্য।
রামমোহন প্রথমবার ইংল্যান্ড (England) এ গেলেন ১৮৩০ সালে। ম্যানচেস্টার ( Manchester ) এ তিনি জাহাজ থেকে অবতরণ করার সঙ্গে সঙ্গে এক বিশাল জনতা তাকে স্বাগত জানায় । ওই বছরই বিখ্যাত লন্ডন ব্রিজ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাজ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তিনি বসার আসন পেয়েছিলেন। রামমোহন ইংল্যান্ডে পৌঁছানোর পর সংবাদপত্রগুলোর নজর ছিল তার উপরেই। রামমোহনের সই করা ছবির বিশাল কদর তখন ইংল্যান্ডে। জনে জনে মানুষ এগুলো সংগ্রহ করতে তৎপর । ডিউক অফ সাসেক্স (Duke of sussex) রামমোহনের জলরঙে আঁকা একটি ছবি তার স্বাক্ষরসহ লাইব্রেরীতে সংরক্ষণ করেন। জেমস সাদারল্যান্ড (james saderland )বলছেন ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে রামমোহন যখন লিভারপুল (Liverpool) তখন তার স্বাক্ষরিত ছবি প্রতিটি ছাপার দোকানে ঝোলানো থাকতো। সাগর পাড়ে এতটাই ছিল রামমোহনের জনপ্রিয়তা।
ইংল্যান্ডে রামমোহনের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয় লিন জাস্টউপিল (Lin Zastoupil ) তার লেখা ‘রামমোহন রায় এন্ড দা মেকিং অফ ভিক্টোরিয়ান ব্রিটেন’ (Rammohon Ray and the making of Victorian Britain)গ্রন্থটি। যেখানে লিন বলেছেন: “রামমোহন ব্রিটেনে এবং ইউরোপ মহাদেশে আন্তঃজাতিক খ্যাতি উপভোগ করেছিলেন, সেইসাথে নতুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও। তার জীবনের শেষ দুই বছর ব্রিটেনে অতিবাহিত হয়েছিল, যেখানে তাকে একটি সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল যা পূর্বে কোন প্রাচ্য ব্যক্তিত্বকে দেওয়া হয়নি।”

ইংল্যান্ডে রাজকীয় আভিজাত্যে আয়োজিত নৈশভোজের আমন্ত্রণ এবং অভ্যর্থনা কক্ষে তার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় , তিনি যেখানেই যান সেখানেই ভিড় জমান । ব্রিটিশ সংবাদপত্রগুলি এমনভাবে তার অবস্থান সম্পর্কে রিপোর্ট করে যা আজকের চলচ্চিত্র বা রক তারকাদের সঙ্গে করে থাকে – রামমোহন ছিলেন ‘সিংহের সিংহ।লিন যোগ করেছেন , রামমোহন লিভারপুলে আসার মুহূর্ত থেকে, দর্শক এবং আমন্ত্রকদের দ্বারা পথগুলো অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
ম্যানচেস্টার (Manchester) এ যাওয়ার জন্য একটি ট্রেনে যাত্রার খবর স্থানীয় সংবাদপত্রে ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে লেখা হয় রামমোহন রায়ের কারণে বিপুল জনসমাগম হওয়ায় প্রচুর পরিমাণে পুলিশের প্রয়োজন পড়েছিল।
ভারতে সতীদাহ প্রথা (custom of Sati )বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে তিনি জড়িয়ে পড়েছিলেন পাশ্চাত্যের দাস প্রথা (custom of slave) বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে। লিন এর মতে ভারতের সতীদাহ প্রথা বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে পাশ্চাত্যের দাস প্রথা বিরোধী আন্দোলনের অনেক মিল রয়েছে । রামমোহনের নেতৃত্বে সতীদাহ প্রথা বিরোধী আন্দোলন ব্রিটিশ নারীদের মধ্যে যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছিল । ব্রিটিশ মহিলারা সতীদাহের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন ইংল্যান্ডে । সতীদাহ প্রথা বিরোধী এবং দাস প্রথা বিরোধী আন্দোলনের দুটি প্রায় সমসাময়িক। তবে ভারতের সতীদাহ প্রথা বিরোধী আন্দোলনের কথা ইংল্যান্ডে পৌঁছেছিল দুজন ইউরোপীয়ের হাত ধরে ।তারা হলেন জেমস সিল্ক বাকিংহাম( james Silk Buckingham ) যিনি কলকাতায় এসেছিলেন সাংবাদিকতার কাজে এবং সেখানেই রামমোহনের সঙ্গে তার পরিচয় , আর অন্যজন হলেন জেমস পেগ (James pegs)।
১৮৩৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি(East India Company) ভারতে যখন বিল পাশ করিয়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়, তখন তার তীব্র প্রতিবাদ করেন রামমোহন রায় । বিলের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে শুধু আবেদনময় ইংল্যান্ডের প্রিভি কাউন্সিলে (Privy Council ) তিনি আবেদন জানান। এমনকি এই বিলের প্রতিবাদে ফারসি ভাষায় প্রকাশিত তার সংবাদপত্র ”মিরাত উল আখবার“(Morar ul Akhbar) বন্ধ করে দেন।
রাজা রামমোহন রায়ের আড়াইশো তম জন্মবর্ষ পূর্তিতে এবার তার জন্মস্থান হুগলী জেলার খানাকুল এর রাধানগর গ্রামের বাড়ি এবং পাশের রঘুনাথপুরের বসতবাড়িটিকে হেরিটেজ ঘোষণা করা হয়েছে।
যুগপ্রবর্তক শব্দটির যদি কোন অর্থ থাকে তাহলে তা রামমোহন রায়ের ক্ষেত্রেই সুপ্রযুক্ত। তার জন্মের সাৰ্ধদ্বিশতবর্ষে বাঙালি সমাজ তাকে যেভাবেই স্মরণ করুক না কেন , বাঙালি সমাজের প্রতি তাঁর অবদানের তুলনায় তা কিছুই নয়।

Thanks
LikeLike