‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্যারোডি করে সজনীকান্ত দাস লিখলেন ‘ব্যাঙ’ কবিতা

বিদ্রোহী কবিতাকে বিদ্রুপ করে রচিত হয়েছে অসংখ্য প্যারোডি। নজরুল জয়ন্তীতে কবিকে স্মরণ করে সাজিয়ে দেওয়া হল সেইসব প্যারোডি এবং বিদ্রোহী কবিতা।

⚔️বিদ্রোহী⚔️

কাজী নজরুল ইসলাম

বল বীর –
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রীর!
বল বীর –
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’
চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি’
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া,
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!
মম ললাটে রুদ্র-ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
বল বীর –
আমি চির-উন্নত শির!

আমি চিরদুর্দ্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা- প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস,
আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর!
আমি দুর্ব্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃংখল!
আমি মানি নাকো কোনো আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম,
ভাসমান মাইন!
আমি ধূর্জ্জটী, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর!
আমি বিদ্রোহী আমি বিদ্রোহী-সূত বিশ্ব-বিধাত্রীর!
বল বীর –
চির উন্নত মম শির!

আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণী,
আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণী!
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ।
আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল,
আমি চল-চঞ্চল, ঠুমকি’ ছমকি’
পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’
ফিং দিয়া দিই তিন দোল্!
আমি চপলা-চপল হিন্দোল!

আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা’,
করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা,
আমি উন্মাদ, আমি ঝঞ্ঝা!
আমি মহামারী, আমি ভীতি এ ধরিত্রীর।
আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ণ চির-অধীর।
বল বীর –
আমি চির-উন্নত শির!

আমি চির-দুরন্ত-দুর্ম্মদ,
আমি দুর্দ্দম, মম প্রাণের পেয়ালা হর্দ্দম্ হ্যায়্ হর্দ্দম্
ভরপুর মদ।
আমি হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক, জমদগ্নি,
আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি!
আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান,
আমি অবসান, নিশাবসান।
আমি ইন্দ্রাণি-সূত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য্য,
মম এক হাতে-বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ-তূর্য্য।
আমি কৃষ্ণ-কন্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা বারিধির।
আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।
বল বীর –
চির উন্নত মম শির।

আমি সন্ন্যাসী, সুর-সৈনিক
আমি যুবরাজ, মম রাজবেশ ম্লান গৈরিক!
আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,
আমি আপনা ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ!
আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,
আমি ইস্ত্রাফিলের শিঙ্গার মহা-হুঙ্কার,
আমি পিনাক-পাণির ডমরু-ত্রিশূল, ধর্ম্মরাজের দন্ড,
আমি চক্র ও মহাশঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ-প্রচন্ড!
আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা-বিশ্বামিত্র-শিষ্য,
আমি দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব!
আমি প্রাণ-খোলা-হাসি উল্লাস, – আমি সৃষ্টি-বৈরী মহাত্রাস,
আমি মহা-প্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহু-গ্রাস!
আমি কভু প্রশান্ত, – কভু অশান্ত দারুণ স্বেচ্ছাচারী,
আমি অরুণ খুনের তরুণ, আমি বিধির দর্প-হারী!
আমি প্রভঞ্জনের উচ্ছাস, আমি বারিধির মহাকল্লোল,
আমি উজ্জ্বল আমি প্রোজ্জ্বল,
আমি উচ্ছল জল-ছল-ছল, চল-ঊর্মির হিন্দোল্ দোল!

আমি বন্ধন-হারা কুমারীর বেণী, তন্বী-নয়নে বহ্নি,
আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম-উদ্দাম, আমি ধন্যি।
আমি উন্মন মন উদাসীর,
আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা-হুতাশ আমি হুতাশীর!
আমি বঞ্চিত ব্যথা পথবাসী চির-গৃহহারা যত পথিকের,
আমি অবমানিতের মরম-বেদনা, বিষ-জ্বালা, প্রিয়-লাঞ্ছিত
বুকে গতি ফের!
আমি অভিমানী চির-ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়,
চিত- চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর!
আমি গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল ক’রে দেখা অনুখন,
আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তা’র কাঁকন-চুড়ির কন্-কন্।
আমি চির-শিশু, চির-কিশোর,
আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচলি নিচোর!
আমি উত্তর-বায়ু, মলয়-অনিল, উদাসী পূরবী হাওয়া,
আমি পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীনে গান গাওয়া!
আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াসা, আমি রৌদ্র রবি,
আমি মরু-নির্ঝর ঝর-ঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি! –
আমি তুরিয়ানন্দে ছুটে চলি এ কি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!
আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে
সব বাঁধ!

আমি উত্থান, আমি পতন, আমি অচেতন-চিতে চেতন,
আমি বিশ্ব-তোরণে বৈজয়ন্তী, মানব বিজয় কেতন!
ছুটি ঝড়ের মতন করতালি দিয়া
স্বর্গ-মর্ত্ত্য করতলে,
তাজি বোরবাক্ আর উচ্চৈস্রবা বাহন আমার
হিম্মত-হ্রেস্বা হেঁকে চলে!
আমি বসুধা-বক্ষে আগ্নেয়াদ্রি, বাড়ব-বহ্নি, কালানল,
আমি পাতালে মাতাল অগ্নি-পাথর-কলরোল-কল-কোলাহল!
আমি তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর তুড়ি দিয়া, দিয়া লম্ফ,
আণি ত্রাস সঞ্চারি ভুবনে সহসা, সঞ্চরি’ ভূমি-কম্প!
ধরি বাসুকির ফনা জাপটি’, –
ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি’!
আমি দেব-শিশু, আমি চঞ্চল,
আমি ধৃষ্ট আমি দাঁত দিয়া ছিঁড়ি বিশ্ব-মায়ের অঞ্চল!

আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী,
মহা- সিন্ধু উতলা ঘুম্-ঘুম্
ঘুম্ চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্বে নিঝ্ঝুম্
মম বাঁশরী তানে পাশরি’
আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী।
আমি রুষে উঠে’ যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া,
ভয়ে সপ্ত নরক হারিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!
আমি বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া!

আমি আমি শ্রাবণ প্লাবন- বন্যা,
কভু ধরণীরে করি বরণিয়া, কভু বিপুল ধ্বংস-ধন্যা –
আমি ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু-বক্ষ হইতে যুগল কন্যা!
আমি অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি,
আমি ধূমকেতু-জ্বালা, বিষধর কাল-ফণি!
আমি ছিন্নমস্তা চন্ডী, আমি রণদা সর্বনাশী,
আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!

আমি মৃণ্ময়, আমি চিন্ময়,
আমি অজর অমর অক্ষয়, আমি অব্যয়!
আমি মানব দানব দেবতার ভয়,
বিশ্বের আমি চির দুর্জ্জয়,
জগদীশ্বর-ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য,
আমি তাথিয়া তাথিয়া মথিয়া ফিরি এ স্বর্গ-পাতাল-মর্ত্ত্য
আমি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!!
আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে
সব বাঁধ!!
আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার,
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!
আমি হল বলরাম স্কন্ধে,আমি উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে।

মহা- বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না –
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত!
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ-হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব-ভিন্ন!
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন!
আমি খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!

আমি চির-বিদ্রোহী বীর –
আমি বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!

১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি বিদ্রোহী (bidrohi poem)কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় বিজলী পত্রিকায় । বিজলী পত্রিকায় প্রকাশের পর পত্রিকাটির চাহিদা এত বেড়ে গিয়েছিল যে সেটি সপ্তাহে দুবার প্রকাশ করতে হয় ।পরে এটি অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত হয়।

১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকের এক রাত । প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ (first world war)ফেরত ২২ বছরের যুবক তখন নজরুল (kaji najrul islam)। কলকাতার তারাতলা লেনের বাড়িতে বসে রাতেই তিনি লিখেছিলেন ১৩৯ পংক্তির কবিতাটি । পরদিন সকালে কবিতাটি শোনান তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোজাফফর আহমেদ কে। কমিউনিস্ট (communist)মোজাফফর আহমেদ (mujaffor ahmed)ছিলেন বিদ্রোহী কবিতার প্রথম শ্রোতা।

সার্ধদ্বিশতবর্ষেও সাগর পাড়ের আইকন তিনিই

‘কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা’ বইতে মুজাফফর আহমেদ লিখেছেন, ” তখন নজরুল আর আমি নিচের তলার পূর্বদিকের অর্থাৎ বাড়ির নিচের দিককার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ঘরটি নিয়ে থাকি। এই ঘরেই কাজী নজরুল ইসলাম তার বিদ্রোহী কবিতাটি লিখেছিলেন। সে কবিতাটা লিখেছিল রাত্রে। তবে রাত্রের কোন সময় তা আমি জানিনে। রাত ১০ টার পর আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে এসে বসেছি , এমন সময় নজরুল বলল, সে একটি কবিতা লিখেছে । এরপর পুরো কবিতাটি পাঠ করে আমাকে শোনাল। সেই হিসেবে বিদ্রোহী কবিতার প্রথম শ্রোতা আমি।”

মুজাফফর আহমেদ আরো লিখেছেন , “আমার মনে হয়, নজরুল শেষ রাত্রে কবিতাটি লিখেছিল, তা না হলে এত সকালে সে আমায় কবিতা পড়ে শোনাতে পারত না।….এখন থেকে চুয়াল্লিশ বছর আগে নজরুলের কিংবা আমার ফাউন্টেন পেন ছিল না। দোয়াতে বারে বারে কলম ডোবাতে গিয়ে তার মাথার সঙ্গে তাল রাখতে পারবে না, এই ভেবেই সম্ভবত সে কবিতাটি প্রথমে পেন্সিলে লিখেছিল।”

বিদ্রোহী কবিতার ব্যাঙ্গ করে সজনীকান্ত দাস (sajanikanta das)’ব্যাঙ’ নামে একটি কবিতাও লিখেছিলে, যা শনিবারের চিঠি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। সেখানে তিনি প্যারোডি করে লিখেছিলেন ব্যাঙ কবিতাটি । তার কয়েকটি লাইন ছিল এইরকম-

‘আমি ব্যাঙ লম্বা আমার ঠ্যাং ভৈরব রসে বর্ষা আসিলে ডাকি যে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ আমি পথ হতে পথে দিয়ে চলি লাফ শ্রাবণ নিশায় পরশে আমার সাহসিকা অভিসারিকা ডেকে ওঠে ‘ বাপ বাপ ‘ । আমি ডোবায় খানায় কাদায় ধুলায় খাটিয়ার তলে কিংবা ব্যবহার হীন চুলায় কদলী বৃক্ষের খোলেও কখনো রহি ব্যাঙাচি রুপেতে বাঁদরের মতো লেজুরেও আমি সরি ৷ আমি ব্যাঙ। আমি সাপ, আমি ব্যাঙেরে গিলিয়া খাই আমি বুক দিয়ে হাঁটি ইঁদুর ছুঁচোর গর্তে ঢুকিয়া যাই।”

ছদ্মনামে প্রকাশিত হওয়ায় নজরুল ধারণা করেছিলেন ‘ব্যাং’ মোহিতলাল মজুমদারের (mohitlal majumder) লেখা। ফলে একসময়ের ঘনিষ্ঠজন ও শুভাকাঙ্ক্ষী মোহিতলালকে মাথায় রেখে নজরুল রচনা করলেন ‘সর্ব্বনাশের ঘণ্টা’ কবিতা। সেখানে তিনি লিখলেন , “মিত্র সাজিয়া শত্রু তোমারে ফেলেছে নরকে টানি, ঘৃণার তিলক পরাল তোমারে স্তাবকের শয়তানী!’

এই কবিতা তাকে উদ্দেশ্য করে নজরুল লিখেছেন এ কথা জানতে পেরে মোহিতলাল ‘দ্রোণগুরু’ কবিতাটি লেখেন। কবিতাটি শনিবারের চিঠি (shonibarer chithi)পত্রিকার ‘বিশেষ বিদ্রোহ সংখ্যা’ য় ছাপা হয়। সেখানে তিনি নিজের ব্রাহ্মণত্বে গর্ব প্রকাশ করে নজরুলকে মূলত অভিসম্পাতই করেছেন। মোহিতলাল মজুমদার লিখলেন ,

“আমি ব্রাহ্মণ, দিব্যচক্ষে দুর্গতি দেখি তোর। অধঃপাতের দেরি নাই আর,ওরে হীন জাতি- চোর।”

এখানেই শেষ নয় । বিদ্রোহী কবিতা কে কেন্দ্র করে গোঁড়া হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ও নজরুল এর উপর খড়গহস্ত হয়ে ওঠে। বিদ্রোহী কবিতার একটি পঙক্তি তে লেখা হয়েছিল, ” আমি বিদ্রোহী ভৃগু ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন।” আবার অন্য একটি পঙক্তিতে ছিল, “খোদার আসন আরশ ছেদিয়া/ উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর” এরপরই নজরুলের ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন তুলতে থাকে গোঁড়া হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়।

কবিতাটি প্রকাশের মাসখানেক পরে কবি গোলাম মোস্তফা ‘সওগাত’ (saogat)পত্রিকায় ‘নিয়ন্ত্রিত’ নামে একটি কবিতায় লেখেন , “ওগো বীর/ সংযত করো, সংহত করো উন্নত তব শির” ‘ইসলাম দর্শন’ পত্রিকার সম্পাদক আব্দুল হাকিম একটি প্যারোডি (parody) তে নজরুলকে বেল্লিক বেইমান, নমরুদ ,ফেরাউন, ভাতৃদ্রোহী বিভীষণ নামে আখ্যায়িত করেন। এই পত্রিকাতেই নজরুল কে উদ্দেশ্য করে লেখা হয়, “লোকটা মুসলমান না শয়তান”

এসবের বিপরীতে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (robindronath tagore) তাঁর স্নেহধন্য নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা শুনে তাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন । ১৯২৬ সালে সজনীকান্ত দাস নজরুলের বিরুদ্ধে চিঠি লেখেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। সে চিঠির প্রত্যুত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখেন, “আধুনিক সাহিত্য আমার চোখে পড়ে না। দৈবাৎ কখনো যেটুকু দেখি, দেখতে পাই, হঠাৎ কলমের আব্রু ঘুচে গেছে। আমি সেটাকে সুশ্রী বলি এমন ভুল করো না।…আলোচনা করতে হলে সাহিত্য ও আর্টের মূলতত্ত্ব নিয়ে পড়তে হবে।”

অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁর ‘কল্লোল যুগ ‘বইয়ে জানাচ্ছেন, “নিজের মুখে কারণে-অকারণে সে [নজরুল] স্নো ঘষত খুব, কিন্তু তার কবিতার এতটুকু প্রসাধন করতে চাইত না। বলত, অনেক ফুলের মধ্যে থাক না কিছু কাঁটা, কণ্টকিত পুষ্পই তো নজরুল ইসলাম। কিন্তু মোহিতলাল তা মানতে চাইতেন না। নজরুলের গুরু ছিলেন এই মোহিতলাল।”

১৩৩৪ সালের বিচিত্রা পত্রিকার শ্রাবণ সংখ্যায়  রবীন্দ্রনাথ ‘সাহিত্যধর্ম’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “মত্ততার আত্মবিস্মৃতিতে একরকম উল্লাস হয়; কণ্ঠের অক্লান্ত উত্তেজনায় খুব একটা জোরও আছে, মাধুর্যহীন সেই রূঢ়তাকেই যদি শক্তির লক্ষণ ব’লে মানতে হয় তবে এই পালোয়ানির মাতামাতিকে বাহাদুরি দিতে হবে সে কথা স্বীকার করি।”

এত সমালোচনা উপেক্ষা করেও বিদ্রোহী কবিতাটি শতবর্ষ পরে আজও সমানভাবে জনপ্রিয়। এক সময়ে কবিতাটি হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম সেরা অস্ত্র। তৎকালীন সাহিত্যিকরা যতই বিদ্রোহী কবিতার সমালোচনা করুন না কেন, নজরুল কিন্তু সফল তার ব্রিটিশ বিরোধিতায়। ‘অসির চেয়ে মসি অনেক বেশি শক্তিশালী’ এই প্রবাদটির সার্থকতা তখনই প্রতিপন্ন হয় যখন ব্রিটিশ সরকার বিদ্রোহী কবিতাটি কে ভয় পায়। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেছেন , “আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা না করলেও যেখানেই এসব পত্রিকা পেতো, সেগুলো জব্দ করতো। আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে একপ্রকার নিষিদ্ধ ছিল”।

শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তিনি সত্য কথা সহজ সরল ভাবে তুলে ধরতে পারেন তিনি তো ‘বিদ্রোহী’ । তৎকালীন সময়ে নজরুল ইসলাম ছাড়া অন্য কোন সাহিত্যিকের রচনা এত পরিমাণে বাজেয়াপ্ত হয়নি ব্রিটিশ সরকারের দ্বারা।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান