দেশের স্বাধীনতায় বিনামূল্যে ১ লক্ষ বোরোলিন বিতরণ

আট থেকে আশি , প্রত্যেক বাঙালির জীবন যাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে সবুজ টিউবের বোরোলিন।

” নিয়তির কাছে এটুকুই প্রার্থনা / সব ক্ষত যেন বোরোলীন দিয়ে সারে ” , লিখেছিলেন শ্রীজাত (srijato)। “বঙ্গ জীবনের অঙ্গ – বোরোলিন “মিশে আছে বাঙালির জীবন চর্যায় – অন্দরে বাহিরে ।

ত্বক যদি কেটে যায়, ফেটে যায়,খসখসে যদি হয় / রোদ্দুরে ঝলসায় , সারা অঙ্গে মেখে নিন / সুরভিত অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বোরোলিন’ ।   কিছু কি মনে পড়ছে ? তাহলে পিছিয়ে যাওয়া যাক বেশ কয়েক দশক।

সময়টা আটের দশক। ইন্টারনেট বিহীন শান্ত বঙ্গ জীবনে ঢেউ তুলেছিল ‘বোরোলিনের সংসার’। রবিবারের দুপুর মানেই বেতারে শ্রাবন্তী মজুমদার ও তাঁর গলায় বোরোলিনের সেই বিখ্যাত জিঙ্গল “সুরভিত অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বোরোলিন”। বোরোলিন (Boroline) আমাদের বাঙালির ‘বঙ্গ জীবনের অঙ্গ’ হয়ে গেছে সেই কবে থেকে। আসলে বাঙালি আর বোরোলিন হল অবিচ্ছেদ্য এক বন্ধন। ‘বোরোলিন– বঙ্গ জীবনের অঙ্গ’, সত্যিই সার্থক ক্যাচলাইন দিয়েছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ (Writuparno Ghosh)।

বাংলায় বোরোলিনের আবির্ভাব স্বদেশী আন্দোলন (Swadeshi movement)এর প্রেক্ষাপটে। তখন দিকে দিকে বিদেশি পণ্য বয়কট ও স্বদেশী পণ্য গ্রহণের হিড়িক।

সালটা ছিল ১৯২৯ । তখনও পুড়ে গেলে বা কোনও রকমের ক্ষত হলে ভরসা ছিল ভেষজ উপাদান ব্যবহার । কারণ বিদেশি ক্রিম সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল । ঠিক সেই সময় বাজারে এলো বাঙালির নিজস্ব অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বোরোলিন । নিয়ে এলেন এক বাঙালি গৌর মোহন দত্ত (Gour Mohon Dutta)।

বোরোলিন নাম ও সেই হাতির ছবি দেওয়া লোগোর পেছনেও রয়েছে ইতিহাস । বোরোলীন নামটি তার উপাদান থেকে উদ্ভূত, বরিক পাউডার থেকে “বোরো” এবং “অলিন” ল্যাটিন (Latin) শব্দ ওলেমের একটি রূপ যার অর্থ তেল। বোরোলীনের লোগো (logo) হাতি বোঝায় স্থিরতা এবং শক্তি। গ্রামীণ এলাকায় বোরোলীন এখনও “হাতিওয়ালা ক্রিম” হিসাবে পরিচিত। সত্যিই তো যার স্থিরতা আজও অবিচল , তার লোগোতে তো হাতি ই থাকবে।

সেই জয়যাত্রা আজও সমান তালে বহমান । বোরোলিনের প্রাণপুরুষ ছিলেন জি ডি ফার্মেসির ( GD farmecy) প্রতিষ্ঠাতা গৌরমোহন দত্ত । ব্রিটিশ সময়কাল থেকে শুরু করে ৯৩ বছর ধরে এখনও সকল বাঙালির অতি প্রিয় ‘ সুরভিত অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বোরোলিন ‘ ।

জওহরলাল নেহরুও নাকি ব্যবহার করতেন বোরোলিন । দেশের ক্রিম বলে কথা ! শীত – গ্রীষ্ম – বর্ষা বাঙালির ঘরে বোরোলিনের উপস্থিতি চিরকালীন । এককথায় , বোরোলিন হল ঋতুপর্ণ ঘোষের কথায় বঙ্গ জীবনের অঙ্গ ‘ । শুধু বাংলা নয় গোটা দেশেই আজ বোরোলিন এর জনপ্রিয়তা।

ব্রিটিশ রাজত্বকালে দেশি দ্রব্য তৈরি করা এবং টিকিয়ে রাখা যথেষ্ট কঠিন কাজ ছিল । এ এক অন্য ধরনের লড়াই । কারণ গৌরমোহন দত্তের জি ডি ফার্মেসির বোরোলিন বিদেশি দ্রব্য বর্জন ও দেশি দ্রব্য গ্রহণের ডাক দিয়ে আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল । এছাড়া তিনি ছিলেন সেই সময়ের কলকাতা ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য । তিনি মনে করতেন , বিপ্লব ছাড়াও দেশ স্বাধীন করার জন্য দেশে স্বাধীন ব্যবসায়ী সংগঠন হওয়া প্রয়োজন , যারা দেশি উপাদান প্রস্তুত ও বিক্রি করে দেশের আর্থিক উন্নতি ঘটাবে । এই উদ্দেশ্যেই ১৯২৯ সাল থেকে সবুজ রঙের টিউবে হাতিমার্কা ক্রিম বোরোলিন আসে বাজারে ।

আজ জি ডি ফার্মেসির কারখানা আছে কলকাতার নিউ আলিপুরে( New Alipur)ও গাজিয়াবাদে(Gajiyabad) । বর্তমানে এই কোম্পানির প্রধান কর্ণধার গৌরমোহন দত্তের নাতি দেবাশিস দত্ত । পরিবেশের প্রতিও এই কোম্পানি যথেষ্ট সজাগ। তাঁরা পরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য রিসাইক্যাল করে পুরনো টিউব বা কোট দিয়েই নতুন টিউব তৈরি করে ।

একলক্ষ বোরোলিন বিতরণের বিজ্ঞাপন যুগান্তর পত্রিকা ১৫ আগস্ট ১৯৪৭

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দেশ যেদিন স্বাধীন হয় সেইদিন দেশবাসীকে বিনামূল্যে ১ লক্ষ বোরোলিন বিতরণ করে জি ডি ফার্মেসী । গৌরমোহন দত্ত কলকাতার আলিপুরে নিজের যে বাড়িতে বোরোলীন বানানো শুরু করেছিলেন সেটি এখন বোরোলীন হাউস নামে পরিচিত। 

এই ক্রিম দেশের ক্রিম , এই ক্রিম প্রকৃতই Make In India স্বার্থক বিজ্ঞাপন । তাই বহিরঙ্গ বদল হয়ে টিউব থেকে প্লাস্টিকের কৌট এলেও , বোরোলিন ১৯২৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ৯৩ বছরেও স্বমহিমায় বিরাজিত প্রতিটি বাঙালি ঘরে।

বোরোলিনের বিজ্ঞাপন গুলি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহিত।

তথ্য সহায়তা : ইন্টারনেট

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান