একটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে আকাশগঙ্গা ছায়াপথ থেকে মাত্র এক আলোকবর্ষ দূরে একটি গ্যালাক্সিতে থাকা ব্ল্যাক হোলে।
একটি ব্ল্যাক হোলকে ব্ল্যাক হোল বলা হয় এর রঙের কারণে, বিশেষ করে যেহেতু এখানে কোনো আলো থাকে না । যদিও আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা হল ব্ল্যাক হোলের প্রভাব। একটি ব্ল্যাক হোলের আশেপাশের এলাকা বিশ্লেষণ করে, আমরা পরিবেশের উপর এর প্রভাব বুঝতে পারি। ব্ল্যাক হোলের কাছাকাছি কোন নক্ষত্রই অক্ষত থাকতে পারে না প্রত্যেকটি ব্ল্যাকহোলের গভীরে নিক্ষিপ্ত হয় । জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর ছায়াপথ আকাশগঙ্গা পা মিল্কিওয়ের মধ্যে যে প্রধান ব্ল্যাক হোলটি খুঁজে পেয়েছেন সেটি পৃথিবী থেকে এক আলোকবর্ষ দূরে ।
ব্ল্যাকহোল বিভিন্ন রকমের হয় , যেমন :
- ১) আদি ব্ল্যাক হোল (Primordial black hole ) – এই ধরনের ব্ল্যাক হোল গুলি সবচেয়ে ছোট আকারের ব্ল্যাকহোল এবং এর পরিসীমা হয় একটা পরমাণুর আকার থেকে একটা পর্বতের সমান ভর বিশিষ্ট ।
- ২ ) স্টেলার ব্ল্যাক হোল ( Stellar black hole) – এগুলি সবচেয়ে সাধারণ ব্ল্যাক হোল এবং এগুলি আকার সূর্যের চেয়ে ২০ গুণ বড় হতে পারে। আকাশগঙ্গা বা মিল্কিওয়ে ছায়াপথ জুড়ে এর বিভিন্ন প্রকার রয়েছে।
- ৩ ) সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল (Super massive black hole )- এ এই ব্ল্যাক হোলগুলি সবচেয়ে বড় আকারের ব্ল্যাক হোল । এর একএকটির আকার সূর্যের থেকে দশ লক্ষ এক মিলিয়ন গুণ বড়ো। এমনই একটি ব্ল্যাকহোল হলো সিগনাস এক্স – 1 ( signus – X1)। এটি ১৯৬০ এর দশকে আবিষ্কৃত প্রথম ব্ল্যাক হোল যা আকারে সূর্যের চেয়ে দশ গুণ বেশি বড়।এই ব্ল্যাক হোলটি পৃথিবী থেকে প্রায় কুড়ি হাজার আলোকবর্ষ (light year ) দূরে অবস্থিত।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে পৃথিবীর নিজস্ব ছায়াপথ সহ প্রায় প্রতিটি গ্যালাক্সি (Galaxy) র কেন্দ্রে একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল রয়েছে। এই ব্ল্যাক হোলগুলিই আসলে গ্যালাক্সিগুলিকে মহাকাশে একসঙ্গে ধরে রাখে।
মিল্কিওয়ে (Milky Way) বা আকাশগঙ্গা ছায়াপথ একাই এক কোটি থেকে একশ কোটি নাক্ষত্রিক-ভরের ব্ল্যাক হোল এবং এর মাঝখানে রয়েছে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল Sgr A * ।

প্রতিটি ছায়াপথে লক্ষ লক্ষ নাক্ষত্রিক-ভর (stellar mass) এর ব্ল্যাক হোল এবং একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল রয়েছে। তবে বাস্তবে এর গণনা করা অনেকটা বালির দানা গণনা করার মতো। ব্ল্যাকহোল গণনা করতে বিশেষ প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়। বিজ্ঞানীরা মহাকাশে বিদ্যমান শব্দ তরঙ্গের প্রকৃত পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে ব্ল্যাকহোল গণনা করেন। এই প্রযুক্তিটি ২০০৩ সালের ফলাফলগুলি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে ।
২০০৩ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পার্সিয়াস ক্লাস্টার (Perseus cluster) এ একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের খোঁজ পান এবং আশেপাশের গ্যাসের মাধ্যমে প্রবাহিত শব্দ তরঙ্গ সনাক্ত করেন। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা তাদের কৌতূহল মেটানোর জন্য শুধুমাত্র এই শব্দগুলিতেই থেমে থাকেননি। তারা মহাকাশে তাপ এবং শব্দ তরঙ্গের চলাচলের মধ্যে একটি সম্পর্ক নির্ণয় করেন। তারা মনে করেন যে ইন্ট্রাক্লাস্টার মাধ্যমের মধ্য দিয়ে চলাচল করা শব্দ তরঙ্গ হল এমন একটি প্রক্রিয়া যা প্লাজমার মাধ্যমে শক্তি পরিবহন করার সময় ইন্ট্রাক্লাস্টার মাধ্যমকে উত্তপ্ত করে।
২০১৫ সালে তৃতীয়বার LIGO (laser interferometer gravitational wave observatory ) বা লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল-ওয়েভ অবজারভেটরি নামক একটি যন্ত্রের মাধ্যমে এই ধরনের তাপ ও শব্দ তরঙ্গের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা নিরূপণ করা যায়। LIGO যন্ত্রটিতে একজোড়া ডিটেক্টর ছিল। যার মধ্যে একটি ডিরেক্টর বসানো হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির হ্যানফোর্ডে এবং অন্যটি লিভিংস্টন, লুইসিয়ানাতে । প্রতিটি LIGO দূরবর্তী মহাজাগতিক ঘটনা থেকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পরিমাপের জন্য বিশেষ ভাবে তৈরি করা হয়েছিল।

LIGO এর মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথমবার ,আমেরিকার হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স (Harvard SmitSonian Centre for astrophysics) এর গবেষকরা মহাকাশে চলমান একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলে চলা ঘটনা রেকর্ড করেছেন। এই ধরনের ব্ল্যাক হোলগুলি পর্যবেক্ষণ করা সহজ কারণ এতে যে প্রবাহমান জল থাকে তা একটি রেডিও আলোর রশ্মি তৈরি করে যা ব্ল্যাক হোলের মধ্যে হওয়া যেকোনো পরিবর্তনকে বোঝা সহজ করে তোলে। এটির দ্বারা ব্ল্যাক হোলের গতি পরিমাপ করাও সম্ভব। বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন যে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল প্রতি ঘন্টায় প্রায় ১১০,০০০ মাইল বেগে ছুটে চলছে। কিন্তু গবেষকদের মধ্যে বেশ কিছু বিষয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে। যেমন এ ধরনের দ্রুতগতির ব্ল্যাকহোল গুলি দুটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের একত্রীকরণ হতে পারে বা বস্তুটি একটি বাইনারি সিস্টেম (Binary System) এর অংশও হতে পারে।

ব্ল্যাক হোলগুলোতে যে আলো দেখা যায় তা সরাসরি ব্ল্যাকহোল থেকে নির্গত হয় না । এটি নির্গত হয় ব্ল্যাকহোল কে ঘিরে থাকা অতি উত্তপ্ত পদার্থকনা থেকে। যেহেতু ব্ল্যাকহোলের কাছাকাছি থাকা যে কোন উপাদান তীব্র আকর্ষণের কারণে ব্ল্যাক হোলের মধ্যে চলে আসে , ফলে এটি প্রবল চাপ ও তাপ এর কারনে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে । এরই ফলস্বরুপ এটি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বর্ণালী জুড়ে আলো নির্গত করে।
গত 23 ফেব্রুয়ারী দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স ( The astrophysical journal letters) -এ প্রকাশিত একটি সমীক্ষা অনুসারে, ব্ল্যাক হোলগুলি, যার নাম PKS 2131-021, সেগুলি পৃথিবী থেকে প্রায় ৯ বিলিয়ন আলোক-বর্ষ দূরে রয়েছে৷ ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস এজেন্সি (National Aeronautics and space agency) বা NASA এর বিবৃতি অনুসারে দুটি বস্তু প্রায় ১০০ মিলিয়ন বছর ধরে একে অপরের দিকে অবিচলিতভাবে এগিয়ে এসেছে । বর্তমানে দুটি ব্ল্যাক হোলই একটি বাইনারি কক্ষপথে প্রতি দুই বছর বা তারও বেশি সময় পর পর একে অপরকে প্রদক্ষিণ করে। যদি এই অনুসন্ধানগুলি সত্য বলে প্রমাণিত হয় তাহলে PKS 2131-021 হবে এপর্যন্ত আবিষ্কৃত বাইনারি ব্ল্যাক হোলের দ্বিতীয় জোড়। বিজ্ঞানীরা পৃথিবী থেকে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে একটি গ্যালাক্সিতে ২০২০ সালে মহাবিশ্বের প্রথম পরিচিত বাইনারি ব্ল্যাক হোল আবিষ্কার করেছিলেন। যাইহোক, এই ব্ল্যাক হোলগুলি প্রতি নয় বছর পর পর পরস্পরকে প্রদক্ষিণ করে । এর থেকে এটা স্পষ্ট যে PKS 2131-021-এর দুই সদস্যের মধ্যে যতটা দূরত্ব রয়েছে তার থেকে তাদের মধ্যে অনেক বেশি দূরত্ব রয়েছে।
