অগ্নিপথ এ পরিবর্তিত হলো বহু নিয়ম

অগ্নিপথ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বিতর্কের আঁচ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে । ইতিমধ্যেই বিক্ষোভের বলি হয়েছে ২ জন। প্রচুর সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস হয়েছে । ইতিমধ্যেই বেশ কিছু নিয়ম পরিবর্তিত হয়েছে এই প্রকল্পে । যে প্রকল্পটিকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বিক্ষোভ আন্দোলন শুরু হয়েছে , সেই প্রকল্পে কি রয়েছে দেখা যাক  –

কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা গত ১৪ ই জুন ভারতীয় যুবকদের সশস্ত্র বাহিনীতে যোগদান করার জন্য একটি নিয়োগ প্রকল্প অনুমোদন করে।  এই প্রকল্পের নাম ‘অগ্নিপথ’ (Agnipath) এবং এই প্রকল্পের অধীনে নির্বাচিত যুবকরা অগ্নিবীর (Agniveer) নামে পরিচিত হবে।

অগ্নিপথ (Agnipath) প্রকল্পে ভারতীয় যুবকদের চার বছরের জন্য সশস্ত্র বাহিনীতে কাজ করার কথা বলা হয়েছে।

⭐ কি এই অগ্নিপথ :-

সরকারের মতে, অগ্নিপথ প্রকল্পটি সশস্ত্র বাহিনীতে নিযুক্ত হতে চাওয়া সক্ষম তরুণদের জন্য তৈরি করা হয়েছে।  এই প্রকল্পের অধীনে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে নিযুক্ত যুবকরা সমাজের তরুণ প্রতিভাকে আকৃষ্ট করতে পারবে।

এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য সশস্ত্র বাহিনীতে তরুণদের যোগদান বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে প্রযুক্তি জ্ঞান এর মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে একটি বিবর্তনমূলক পরিবর্তন সাধন। এই পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর গড় বয়সের প্রায় ৪ – ৫ বছর কমে যাবে বলে ধারণা করা হয়েছে। বর্তমানে ভারতীয় সেনার গড় বয়স ৩০ বছর। কেন্দ্রে র দাবি এই নিয়োগের ফলে সেনার গড় বয়স কমে ২৫ – ২৬ হবে। সরকারের মতে, অনুশাসন , অধ্যবসায় এবং লক্ষ্যের প্রতি দৃঢ় যুবকদের মাধ্যমে জাতি উপকৃত হবে।

⭐ অগ্নিবীর কারা : –

অগ্নিপথ (Agnipath) প্রকল্পের অধীনে সশস্ত্র বাহিনীতে যোগদানকারী যুবকরা অগ্নিবীর (Agniveer) নামে পরিচিত হবেন ।

⭐ বেতন কাঠামো : –

👉 প্রথম বছরে ‘ অগ্নিবীর’(Agniveer) দের মাসে বেতন হবে মাসে ৩০ হাজার টাকা । তবে হাতে পাবেন ২১ হাজার টাকা ।

👉 দ্বিতীয় বছরে মাসিক বেতন হবে ৩৩ হাজার টাকা । হাতে পাবেন ২৩,১০০ টাকা ।

👉 তৃতীয় বছরে মাসিক বেতন বেড়ে হবে ৩৬,৫০০ টাকা । হাতে পাওয়া যাবে ২৫,৫৮০ টাকা।

👉 শেষ বছরে ওই বেতন গিয়ে দাঁড়াবে মাসিক ৪০ হাজার টাকায় । সে সময়ে জওয়ানেরা হাতে পাবেন ২৮ হাজার টাকা ।

⭐ চার বছর পর : –

প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে , চার বছরের কাজের শেষে সেবা নিধি প্যাকেজের আওতায় মোট আয়করমুক্ত ১১.৭১ লক্ষ টাকা পাবেন ‘ অগ্নিবীর’রা । যদিও পেনশন বা গ্র্যাচুইটি তারা পাবেন  না । নিয়মিত সেনাদের মতো স্বাস্থ্য বা ক্যান্টিন সুবিধাও পাবেন না । চাকরি জীবনে কর্তব্যরত অবস্থায় মৃত্যু হলে পরিবার প্রায় ১ কোটি টাকা ও কর্তব্যরত অবস্থায় একশো শতাংশ বিকলাঙ্গ হয়ে পড়লে তাঁরা সর্ব্বোচ্চ ৪৪ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ পাবেন ।

‘অগ্নিবীর’(Agnipath) দের যাতে চার বছর পরে চাকরি পেতে অসুবিধা না হয় , তার জন্য সরকারি ভাবে হাতে – কলমে বিভিন্ন ধরনের ( ITI আইটিআই ) প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে । চার বছর পর ওই সেনারা যাতে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় চাকরি পান , তাও দেখার কথা বলা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (University Grant Commission) জানিয়েছে , ‘অগ্নিবীর’রা প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে যে সব বিষয়ে দক্ষতা লাভ করবেন , সেই বিষয়গুলিকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে ভাবছে ইউজিসি । যাতে ওই শংসাপত্র তাঁদের স্নাতক পড়াশোনার ক্ষেত্রে কাজে লাগে।

এছাড়াও  আরো বলা হয়েছে চার বছর পর আনুমানিক ১১.৭১ লক্ষ টাকার যে’সেবা নিধি’ একজন অগ্নিবীর পাবেন , তাতে তিনি সেই টাকা ব্যবহার করে ভবিষ্যতে স্বনির্ভর হতে পারবেন।

⭐ একনজরে অগ্নিবীর : –


🇮🇳 ১৭.৫ – ২১ বছর (পরে ২০২২ সালের জন্য বয়সসীমা বাড়িয়ে ২৩ করা হয়েছে) পর্যন্ত বয়সি ৪৫ হাজার জনকে চার বছরের জন্য বাহিনীতে নিয়োগ করা হবে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে । ২০২৩ সালের জুলাইয়ের মধ্যে প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ পর্ব সমাপ্ত হবে ।

🇮🇳 অনলাইনে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়োগ সম্পন্ন হবে । বাহিনীর যে পদের জন্য যে যোগ্যতা প্রয়োজন , সেই যোগ্যতা প্রযোজ্য মেনেই নিয়োগ হবে।

🇮🇳 অগ্নিপথে মহিলাদেরও নিয়োগ করা হবে ।  অগ্নিবীররা সশস্ত্র বাহিনীর অঙ্গ হিসেবেই কাজ করবেন। প্রথম  ছ’মাস প্রশিক্ষণ চলবে । মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা বেতন পাবেন । থাকবে অন্য ভাতাও ।

🇮🇳 চার বছর পরে ওই সেনাদের ২৫ শতাংশকে  বাহিনীতে রাখা হবে ।  বাকি ৭৫ শতাংশ ‘অগ্নিবীর’-দের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। অফিসারের নীচের স্তরের ক্যাডারে যোগদান করে তাঁরা পুরো ১৫ বছর কাজ করবেন । বাকিরা বাহিনী ছেড়ে যাওয়ার সময়ে ১১-১২ লক্ষ টাকার এককালীন প্যাকেজ পাবেন। তবে কোনো পেনশনের ব্যবস্থা থাকবে না । তবে কাজ করার সময়ে কেউ মারা গেলে বা কারও অঙ্গহানি হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।

🇮🇳 চার বছরের পরিষেবা শেষে যে অগ্নিবীররা উদ্যোগপতি হতে চায়, তাদের একটি আর্থিক প্যাকেজ এবং ব্যাঙ্ক ঋণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি যারা আরও পড়াশোনা করতে চায়, তাদের দ্বাদশ শ্রেণির সমমানের সার্টিফিকেট এবং ব্রিজ কোর্স করার সুযোগ দেওয়া হবে।

⭐ নিয়োগ প্রক্রিয়া : –

অগ্নিবীর প্রকল্পে সকল নিয়োগ ‘অল ইন্ডিয়া অল ক্লাস’ (all India all class )ভিত্তিতে হবে এবং বয়সসীমা হবে ১৭.৫ থেকে ২১ বছরের মধ্যে । তবে দেশজোড়া বিক্ষোভের প্রেক্ষিতে এবং কোভিডের এর কারণে গত দু’বছর কেন্দ্রীয় বাহিনীতে কোন নিয়োগ না হওয়ায় ২০২২ সালের জন্য বয়সসীমায় দুই বছরের ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র । অগ্নিবীরদের সশস্ত্র বাহিনীতে তালিকাভুক্তির জন্য নির্ধারিত সকল মেডিকেল যোগ্যতার শর্ত পূরণ করতে হবে।

⭐ শিক্ষাগত যোগ্যতা : –

অগ্নিবীরদের শিক্ষাগত যোগ্যতা( educational qualification) বিভিন্ন বিভাগের জন্য বিভিন্নরকম। সর্বনিম্ম যোগ্যতা দশম বা দ্বাদশ শ্রেণী উত্তীর্ণ। উদাহরণস্বরূপ: জেনারেল ডিউটি (general duty বা জিডি) সৈনিক পদে প্রবেশের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা হল দশম শ্রেণি ।

⭐ সংরক্ষণ : –

প্রতিরক্ষা মন্ত্রক প্রথমে দেওয়া নিয়ম বদল করে জানিয়েছে , কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক, কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (CRPF) এবং অসম রাইফেলসে (Assam Rifles )অগ্নিবীরদের  জন্য ১০ শতাংশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে । কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং অসম রাইফেলসে অগ্নিবীরদের নিয়োগের জন্য বয়সের নির্ধারিত ঊর্ধ্বসীমায় ৩ বছর ছাড় দেওয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক (home ministry of India)। এছাড়াও, অগ্নিবীরদের প্রথম ব্যাচের জন্য বয়সের নির্ধারিত ঊর্ধ্বসীমা ৫ বছরের জন্য শিথিল করা হয়েছে।

⭐ ভবিষ্যত পরিকল্পনা : –

কেন্দ্রের তরফে আরও জানানো হয়েছে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রকে ‘অগ্নিবীর’দের (Agniveers) ১০ শতাংশ আসন সংরক্ষণ এর পাশাপাশি তাঁদের আরও ৬টি মন্ত্রকে নিয়োগ করা হবে। অসামরিক বিমান পরিবহন ক্ষেত্র, অসামরিক প্রতিরক্ষা ক্ষেত্র , উপকূলরক্ষী বাহিনী-সহ মোট ১৬টি প্রতিরক্ষা সংস্থাতেও তাঁদের নিয়োগ করা হবে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক বাদে অন্যত্র সংরক্ষণ হবে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ।


চার বছরের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর ‘অগ্নিবীর’দের (Agniveers) নিয়োগ করা হবে ১৬টি ডিফেন্স পাবলিক সেক্টরে।

এই তালিকায় রয়েছে – হিন্দুস্থান এরোনটিক্স লিমিটেড (HAL), ভারত ইলেক্ট্রনিক্স লিমিটেড (BEL) , ভারত আর্থ মুভারস লিমিটেড (BEML), ভারত ডায়নামিক্স লিমিটেড (BDL) , গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জেনিয়ার্স লিমিটেড (GRSE) , গোয়া শিপইয়ার্ড লিমিটেড (GSL), হিন্দুস্থান শিপইয়ার্ড লিমিটেড (HSL), মাজাগন ডক শিপবিল্ডার্স (MDL), মিশ্রা ধাতু নিগম লিমিটেড , আর্মউড ভেহিকেল নিগম লিমিটেড (AVNL) ,অ্যাডভান্স ওয়েপন অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট ইন্ডিয়া লিমিটেড (AW&EIL), মিউনিশনস ইন্ডিয়া লিমিটেড (MIL), ইয়াত্রা ইন্ডিয়া লিমিটেড (YIL),গিল্ডার্স ইন্ডিয়া লিমিটেড (GIL), ইন্ডিয়া অপটেল লিমিটেড (IOL) এবং ট্রুপ কমফোর্ট লিমিটেড (TCL) এর মতো সংস্থা গুলি।

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান