আসাম-মেঘালয় ক্যাডারের এই মহিলা ফরেস্ট অফিসার বন বিভাগের পৌরুষ জমিদারি ভেঙে বারবার মুখোমুখি হয়েছেন তীব্র বিপদের । তাকে নিয়েই তৈরি হয়েছে বলিউডি সিনেমা ‘শেরনি’।

স্থান কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যান ( Kaziranga National park )এর কোহরা রেঞ্জ । আড়িমোড়া ওয়াচ টাওয়ারের কাছে হঠাৎই জ্বলে উঠলো সার্চলাইটের তীব্র আলো। কারণ সেখানে তখন ওত পেতে রয়েছে তিন তিনটে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সামনে অসহায় এক গন্ডার শাবক । দলের নেতৃত্বে মা বাঘিনী, বাকি দুটো তার সন্তান।
প্রথম বাক্তির ৩০ মিটার এর মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছেন জিপসি চালক। অ্যাসিস্ট্যান্ট কনজারভেটর অফ ফরেস্ট ম্যাডাম যখন চাপা গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন , তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠার জন্য, তখন বিপদ বুঝতে পারলেন জিপসি চালক। বিদ্যুৎ গতিতে গাড়িতে উঠে দরজা জানালা বন্ধ করে রিভার্স গিয়ারে গাড়ি চালালেন চালক । গাড়ি ছুটলো পেছনদিকে। ইতিমধ্যেই একটা বাঘ তাড়া করেছে গাড়িটিকে ।তীব্র রাগে গাড়ি লক্ষ্য করে ঝাঁপ দিল বাঘটি। তার থাবা দুটো এসে পড়ল জিপসির বনেটের উপর । তবে শেষ পর্যন্ত ধীরে সুস্থেই বাচ্চা দুটো কে সঙ্গে নিয়ে বাহিনী জঙ্গলের ভেতরে চলে গেল।
এই ঘটনা সেদিনের সেই অ্যাসিস্ট্যান্ট কনজারভেটর অফ ফরেস্ট ম্যাডাম অর্থাৎ কাশিপালায়াম মহেশ্বরী অভর্ণা র মনে বাঘের প্রতি অপত্য স্নেহের জন্ম দেয় । সেই থেকে শুরু করে তিনি অনেকবার জঙ্গলে বাঘের সঙ্গে মোলাকাত করেছেন।
বন বিভাগে পুরুষ কর্মীদেরই রমরমা। কিন্তু কে এম অভর্ণা সেই ধারণা বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর মতে , আসল সাহস পেশিতে নয় থাকে কলজেতে।
কাশি পালায়াম মহেশ্বরী অভর্ণা ( kashipalayam Maheshwari Avarna ) তামিলনাড়ুর মেয়ে। তামিলনাড়ুর ইরোডের গোবিচেটটিপালায়ামের মেয়ে অভর্ণা পরিবারের প্রথম আইএফএস। ছোট থেকে জঙ্গল আর প্রকৃতিকে বড় ভালোবাসতেন তিনি আর সেইতা নেই জঙ্গল জীবনের পুরুষ শাসিত চাকরি জীবনে প্রবেশ করে সকল কে ভুল প্রমাণিত করে আদর্শ ফিল্ড অফিসার হয়ে উঠেছিলেন অভর্ণা।
তাই সত্য কাজে যোগ দেওয়া মেয়েটা অবলীলায় কাঁধে তুলে নেয় .৩১৫ বোরের ভারী রাইফেলটি। আসাম-মেঘালয় ক্যাডারে ২০১৩ ব্যাচের আইএফএস ( Indian forest service )কে এম অভর্ণার পোস্টিং হয় কাজিরাঙার কেন্দ্রীয় রেঞ্জ কোহরায়। তার আগে অভর্ণা ছিলেন গোলাঘাট ফরেস্ট ডিভিশনে। প্রথম থেকে অত্যন্ত ডাকাবুকো অপর্ণা কোন সময়ই অফিসে বসে মনিটরের চোখ আর কি বোর্ডে আঙ্গুল ছোয়ানোর কাজ করতে পছন্দ করতেন না। দূরবীনে চোখ আর রাইফেল এর ট্রিগারে আঙ্গুল এই ছিল এই ফরেস্ট অফিসারের কাজিরাঙার দিন ।চোরা শিকারিদের হাত থেকে জঙ্গলের পশুদের রক্ষা করতে বনরক্ষীদের নিয়ে সারারাত তিনি বসে থাকতেন জঙ্গলে। তিনি যে কয় মাস কোহরায় ছিলেন , সেখানে চোরাশিকার এর একটি ঘটনাও ঘটেনি।এমনকি তিনি কোহরায় একশ্রেণীর বনকর্মীদের মধ্যে চলা গ্রামবাসীদের অবৈধ ভাবে মাছ শিকারও বন্ধ করেন। তার উদ্যোগেই জঙ্গলের আসে পাশে নিষিদ্ধ হয় প্লাস্টিকের ব্যবহার। তার উৎসাহেই মহিলা বনকর্মীরা রাইফেল হাতে বন টহলে নিযুক্ত হয়।
বহুবার হাতির মুখে পড়া বাঘের মুখে পড়া মানুষের সামনে পড়া চোরাশিকারির বুলেটের সামনে পড়া গাড়ি দুর্ঘটনার মত অনেক ঘটনা ঘটেছে কাজে দেবে কিন্তু প্রত্যেকটা ঘটনায় বন্যপ্রাণীর জন্য প্রাণ সঁপে দেওয়ার জেদ বাড়িয়ে দিয়েছে অভর্ণার।

একবার অসমের গোলাঘাট জেলায় মেঘলা চিতা বাঘ শিকারের খবর পেয়ে তিনি পৌছলেন ঘটনাস্থলে মহিলা অফিসার কে দেখে গ্রামের মানুষ পাত্তা দেয়নি। কিন্তু গ্রামবাসীদের বিক্ষোভকে তুচ্ছ করে সেই মহিলা যখন অভিযুক্তকে কোমরে দড়ি পরিয়ে গ্রেফতার করেন তখন গ্রামবাসীদের বিক্ষোভ বিদ্রোহের চেহারা নেয়। গ্রামবাসীদের দাবি ছিল গ্রামের কাউকে গ্রেফতার করা যাবে না। কিন্তু সেইসব বিক্ষোভকে থোড়াই কেয়ার করে পরদিন ৬ জনকেই আদালতে তোলেন অকুতোভয় অভর্ণা।

কয়েক বছর আগে মহারাষ্ট্রের ইয়াভাতমাল জঙ্গল – গ্রামে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল অবনী নামে একটি বাঘ । বনকর্মীদের কাছে যার পরিচয় ছিল টি-১ । টি – ১ কে ধরার দায়িত্ব পড়ে অভর্ণা র উপর। অভর্ণা দায়িত্ব নেওয়ার আগেই অবনী পাঁচজন মানুষ মেরেছিল । তবে শেষ পর্যন্ত বহু চেষ্টা সত্ত্বেও বনদপ্তর, আমলাতন্ত্র, রাজনৈতিক অসহযোগিতা ইত্যাদি কারণে অবনীকে জীবিত অবস্থায় ধরতে পারেননি কে এম অভর্ণা। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে বন দপ্তরের নিযুক্ত শিকারি নবাব শতাফ আলী খানের ছেলে আসগর আলী খানের গুলিতে অবনী মারা যায়। যেটা একেবারেই মেনে নিতে পারেননি অভর্ণা। মুখ্য বনপালকে পাঠানো তার রিপোর্টে তিনি জানিয়েছিলেন , অবনীকে বিজ্ঞানসম্মত ভাবে ঘুম পাড়ানো গুলিতে কাবু করার চেষ্টা হাতছাড়া করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। বনদপ্তর এর কাজের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনা পর অভর্ণার রিপোর্টের ভিত্তিতেই ২০১৯ সালে অবনী হত্যার ফাইল নতুন করে খোলা হয়েছে ।তৈরি করা হয়েছে তদন্ত কমিটি। বর্তমানে কে এম অভর্ণা মহারাষ্ট্রের ব্যাম্বু রিসার্চ এন্ড ট্রেনিং সেন্টারের অধিকর্তা পদে নিযুক্ত। মন জঙ্গলে পড়ে থাকলেও বর্তমানে বাঁশের বেড়ায় বাধা তার জীবন । কারণ তিনি আমলাতন্ত্রের পোষ মানেন নি।
মহারাষ্ট্রের অবনী এবং ডেপুটি কমিশনার অফ ফরেস্ট অভর্ণা কে নিয়ে সম্প্রতি ও টি টি প্লাটফর্মে মুক্তি পায় বিদ্যা বালান অভিনীত ‘শেরনী’ ছবিটি। জঙ্গল জীবন কে কেন্দ্র করে এটিই প্রথম বলিউড সিনেমা।
