গোবেকলি তেপের আবিষ্কার মানব সভ্যতার সূচনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে । এখানে আবিষ্কৃত হয়েছে বিশ্বের সর্বপ্রাচীন মন্দির।

গোবেকলি তেপে (Göbekli Tepe ) তুর্কি ভাষায় যার অর্থ ‘লম্বা পাহাড়’ । গোবেকলি তেপে বর্তমানে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃত। তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে আনাতোলিয়া মালভূমি অঞ্চলে শানলিউরফা প্রদেশের রাজধানী উরফা (Urfa) থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে অবস্থিত একটি প্রত্নক্ষেত্র হলো গোবেকলি তেপে(Göbekli Tepe )। এই গোবেকলি তেপের আবিষ্কার মানব সভ্যতার প্রাচীন ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। একসময় ভাবা হতো কৃষি কাজ শেখার পর থেকেই মানুষ দলবদ্ধ হয়েছে , স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শিখেছে, গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন গড়ে তুলেছে । কিন্তু কৃষি সভ্যতার থেকেও প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন টি মানুষের দলবদ্ধতার প্রমাণ দেয়।
১৯৬০ এর দশকে তুরস্কের ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একদল ছাত্র তুরস্কের সীমান্তবর্তী শানলিউরফা প্রদেশের ওরেনসিক শহরে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এর খোঁজে গিয়েছিল । স্থানীয় মানুষের মুখে এই পাহাড়ি অঞ্চল টি পরিচিত গোবেকলি তেপে নামে । এখানে এই প্রত্নতাত্ত্বিক দলটি একটি ফলক খুঁজে পায়। যা থেকে তাদের মনে ধারণা হয় এটি কোন মধ্যযুগীয় সমাধিক্ষেত্র । সমাধি ক্ষেত্র সম্পর্কে তাদের আগ্রহ না থাকায় তারা আর এ নিয়ে বেশি দূর এগোয়নি। তবে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিল তা হল তাদের গবেষণাপত্রে ওই ফলকটির উল্লেখ তারা করে রেখেছিল।

এর প্রায় ৩৪ বছর পরে ১৯৯৪ সালে জার্মানির প্রত্নতত্ত্ববিদ ক্লস স্কিমিট ( Klaus Schmit ) এর কাছে কোন ভাবে সেই রিসার্চ পেপার পৌঁছয়। প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সম্পর্কে ক্লাসের গভীর কৌতূহল ছিল। তিনি ওই ফলকটির রহস্য সন্ধানে চলে আসেন তুরস্ক । এরপর একদিন খননকাজের সরকারি অনুমতি নিয়ে তিনি পৌঁছে যান গোবেকলি তেপে । এরপরই মাটির নিচ থেকে উদ্ধার হয় আলাদা আলাদা কুড়িটি অট্টালিকার সমন্বয়ে গঠিত এক প্রাচীন উপাসনা স্থান। পরবর্তী সময়ে কার্বন-১৪ (carbon-14) পরীক্ষার মাধ্যমে এর বয়স নির্ণয় করা হয়েছে। যা থেকে জানা যায় গোবেকলি তেপে নির্মিত হয়েছিল প্রায় সাড়ে এগারো হাজার বছর পূর্বে । আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব দশম সহস্রাব্দে এটি নির্মিত হয় এবং খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম সহস্রাব্দ পর্যন্ত এর ব্যবহার ছিল বলে অনুমান করা হয় । ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য স্থল (UNESCO World Heritage Site )এর তালিকায় এখনো পর্যন্ত আবিষ্কৃত এটি সর্ব প্রাচীন উপাসনা স্থল এর নিদর্শন (২০১৮ সাল)।

গোবেকলি তেপে ২০ বৃত্তে ২০০ টিরও বেশি স্তম্ভ আবিষ্কৃত হয়েছে । প্রতিটি স্তম্ভের উচ্চতা প্রায় কুড়ি ফুট এবং ওজন ১০ থেকে ২০ পর্যন্ত । স্তম্ভ গুলিকে মাটিতে গর্ত করে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। অনেকটা ইংরেজি ‘টি’ (T )অক্ষরের মতো একটি উলম্ব স্তম্ভের মাথায় আরেকটি পাথরের স্তম্ভ কে আড়াআড়িভাবে বসানো হয়েছিল । কতটা প্রযুক্তিগত জ্ঞান থাকলে এত ভারী পাথরকে সঠিক অবস্থানে স্থাপন করা সম্ভব , তা আজকের দিনে ভাবলে অবাক হতে হয় ।অনুমান করা হয় , যে পাথরগুলি স্তম্ভ নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলি ওই স্থানেই বা খুব কাছাকাছি স্থানে পাওয়া যেত । কারণ এত ভারী পাথর তখনকার দিনে দূর থেকে নিয়ে আসা সম্ভব ছিল না। তেপে টির উচ্চতা ১৫ মিটার (৪৯ ফুট) এবং ব্যাস প্রায় ৩০০ মিটার (৯৮০ ফুট)। এটি সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় ৭৬০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত।

প্রতিটি পাথরের গায়ে নানান অর্থবহ আকৃতি ও চিহ্ন খোদাই করা আছে । বেশকিছু প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর চিত্র সহ সাপ , শিয়াল এবং শুয়োর, কিন্তু এছাড়াও অরোচ , গাজেল, মাউফ্লন (বন্য ভেড়া), ওনাগার , ক্রেন , হাঁস এবং শকুন এর ছবি খোদাই করা হয়েছে পাথরগুলির গায়ে ।

আরো দেখুন বারমুডা ট্রায়াঙ্গল (Bermuda Triangle) রহস্যের সন্ধানে

এদিকে গোবেকলি তেপের আবিষ্কার মানব সভ্যতার সূচনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে । এতদিন ধরে আমরা জেনে এসেছি , মানব সভ্যতার সূচনা হয়েছিল কৃষিকাজ শেখার হাত ধরে । কৃষিকাজের জন্য জমি তৈরি , রক্ষণাবেক্ষণ এবং শস্য সংরক্ষণের সহ বিভিন্ন কাজের জন্য মানুষ দলবদ্ধ ভাবে একত্রে বসবাস করতে শিখেছিল । কৃষি জমির নিকটে তারা বসতি গড়ে তুলেছিল। আর তা থেকেই সূচনা হয় সভ্যতার । খাদ্য সংগ্রাহক থেকে মানুষ পরিণত হয় খাদ্য উৎপাদকে।

কিন্তু গোবেকলি তেপের আবিষ্কার চিরন্তন এই মতবাদে জল ঢেলে দিয়েছে । কারণ ,কৃষি সভ্যতার সূচনার ৫০০ বছর আগেই এটি নির্মিত। এর বড় বড় পাথরের আকার এবং খোদাই দেখে ধারণা করা হয় , এটি নির্মাণে অন্তত ১০ বছরের পরিশ্রম রয়েছে । আর অনেক মানুষের শ্রম ছাড়া এরকম একটি ভারী পাথর নির্মিত নিদর্শন এর নির্মাণকাজের কথা কল্পনা করা যায় না । যার অর্থ , কৃষিকাজ শুরুর আগেই মানুষ একত্রে বসবাস করতে শুরু করে । দশ বছর ধরে নিশ্চয়ই যাযাবররা এরকম একটি বিশাল স্থাপনা নির্মাণ করবে না । এই তথ্য জানার পর স্বাভাবিকভাবেই মনে হয় মানব সভ্যতার সূচনা পর্বের ইতিহাস আবার নতুন করে লেখার প্রয়োজন বোধহয় আছে ।

আনুমানিক দশ হাজার খ্রীস্ট পূর্বাব্দে গোবেকলি তেপে নির্মিত হয় । গোবেকলি তেপে চূড়ান্তভাবে পরিত্যাগ করে যাবার আগে সে সময়ের মানুষেরা একে পাথর আর মাটি দিয়ে ভরাট করে দিয়ে যায় । ফলে দীর্ঘদিন ধরে অক্ষত অবস্থায় মাটিচাপা পড়ে ছিল স্থাপনাটি । প্রাচীন যুগের এই মানুষদের আমরা এতদিন অসভ্য বলেই জেনে এসেছি । কিন্তু তাদের সময়েই সভ্যতার সূচনার ইঙ্গিত দেয় এই গোবেকলি তেপে ।

তবে প্রত্ন ক্ষেত্র কী কাজে লাগত, সে বিষয়ে সম্পূর্ণ আলোকপাত এখনো সম্ভব হয়নি। সম্ভবত স্থানীয় মানুষের উপাসনা স্থান হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতো । এখনও পর্যন্ত এখানে প্রাপ্ত শিলালিপি গুলির পাঠোদ্ধার করা যায়নি । যেদিন তা সম্ভব হবে সেদিন অবশ্যই খুলে যাবে ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় । ১৯৯৬ সাল থেকেজার্মান রিসার্চ ফাউন্ডেশন (German Research Foundation) , জার্মান আর্কিওলজিক্যাল ইনস্টিটিউট (German Archaeological Institute ) কর্তৃক এখানে খননকার্য চলছে। কিন্তু এখানকার একটি বড়ো অংশে এখনও খননকার্য চালানো হয়নি।
তথ্যসূত্র ও চিত্র সৌজন্য :- ঊইকিপিডিয়া ও অন্তর্জাল

আল্লাহ্ বলেন, আমি এর আগে তোমাদের চেয়ে অনেক শক্তি শালী অবাধ্য জাতি ধ্বংস করে দিয়েছি। রেফারেন্স মনে করতে পারিনি। দুঃখিত।
LikeLike