বারমুডা ট্রায়াঙ্গল (Bermuda Triangle) রহস্যের সন্ধানে

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল যা শয়তানের ত্রিভুজ  নামেও পরিচিত, আটলান্টিক মহাসাগরের একটি বিশেষ অঞ্চল, যেখানে বেশ কিছু জাহাজ ও উড়োজাহাজ রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়ার কথা বলা হয়। অনেকে মনে করেন ঐ সকল অন্তর্ধানের কারণ নিছক দুর্ঘটনা, যার কারণ হতে পারে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অথবা চালকের অসাবধানতা। আবার চলতি উপকথা অনুসারে এসবের পেছনে দায়ী হল কোন অতিপ্রাকৃতিক শক্তির উপস্থিতি। তবে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য রয়েছে যে, যেসব দুর্ঘটনার উপর ভিত্তি করে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলকে চিহ্নিত করা হয়েছে তার বেশ কিছু ভুল, কিছু লেখক দ্বারা অতিরঞ্জিত হয়েছে এমনকি কিছু দুর্ঘটনার সাথে অন্যান্য অঞ্চলের দুর্ঘটনার কোনই পার্থক্য নেই।

ত্রিভুজের বিস্তৃতি :

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন লেখকের বর্ণনায় বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের বিস্তৃতিতে পার্থক্য রয়েছে। এই ত্রিভূজের উপর দিয়ে মেক্সিকো উপসাগর থেকে উষ্ণ সমুদ্র স্রোত বয়ে গেছে। এই তীব্র গতির স্রোতই মূলত অধিকাংশ অন্তর্ধানের কারণ। এখানে কখনও হঠাৎ করে ঝড় ওঠে আবার থেমেও যায়, গ্রীষ্মে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। বিংশ শতাব্দীতে টেলিযোগাযোগ, রাডার ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি পৌঁছানোর আগে এমন অঞ্চলে জাহাজডুবি খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা। এই অঞ্চল বিশ্বের ভারী বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকারী পথগুলোর অন্যতম। জাহাজগুলো আমেরিকাইউরোপ ও  ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ থেকে যাতায়াত করে। এছাড়া এটি হল প্রচুর প্রমোদতরীর বিচরণ ক্ষেত্র। এ অঞ্চলের আকাশপথে বিভিন্ন রুটে বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত বিমান চলাচল করে। ত্রিভূজের বিস্তৃতির বর্ণনায় বিভিন্ন লেখক বিভিন্ন মত দিয়েছেন। কেউ মনে করেন এর আকার ট্রাপিজয়েডের মত, যা ছড়িয়ে আছে ফ্লোরিডাবাহামা এবং ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ এবং ইশোর পূর্বদিকের আটলান্টিক অঞ্চল জুড়ে, আবার কেউ কেউ এগুলোর সাথে মেক্সিকো উপসাগরকেও যুক্ত করেন। তবে সাধারণ ভাবে যে অঞ্চলের ছবি ফুটে ওঠে তাতে রয়েছে ফ্লোরিডার আটলান্টিক উপকূল, পুয়ের্তো রিকো, মধ্য আটলান্টিকে বারমুডার দ্বীপপুঞ্জ এবং বাহামা ও ফ্লোরিডা স্ট্রেইটস এর দক্ষিণ সীমানা যেখান ঘটেছে অধিকাংশ দূর্ঘটনা।

বারমুডা ট্রায়াঙ্গল

ত্রিভূজ এর ইতিহাস :

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল বিষয়ে যারা লিখেছেন তাদের মতে ক্রিস্টোফার কলম্বাস সর্বপ্রথম এই ত্রিভুজ বিষয়ে অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা লিখেন। তিনি লিখেছিলেন যে তার জাহাজের নাবিকেরা এ অঞ্চলের দিগন্তে আলোর নাচানাচি, আকাশে ধোঁয়া দেখেছেন। এছাড়া তিনি এখানে কম্পাসের ভুল দিক নির্দেশনার কথাও বর্ণনা করেছেন। তিনি ১১ই অক্টোবর, ১৪৯২ তে তার লগ বুকে লিখেন –” triangle means the residence of devil “.

বর্তমানে বিশেষজ্ঞরা প্রকৃত লগবুক পরীক্ষা করে যে মত দিয়েছেন তার সারমর্ম হল – নাবিকেরা যে আলো দেখেছেন তা হল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মানুষ যারা নৌকায় করে মাছ ধরতে সমুদ্রে যান তারাই রান্নার জন্য নৌকায় আগুন এর ব্যবহার করেন । আর কম্পাসে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল তা নক্ষত্রের অবস্থান পরিবর্তনের কারণে। ১৯৫০ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর ই. ভি. ডব্লিউ. জোন্স ( E.V.W. Jones) সর্বপ্রথম বারমুডা ত্রিভুজ নিয়ে সংবাদ পত্রে লেখেন। এর দু বছর পর ‘ফেট’ (Fate) ম্যাগাজিনে জর্জ এক্স. স্যান্ড( George X. Sand) “সী মিস্ট্রি এট আওয়ার ব্যাক ডোর” (“Sea Mystery At Our Back Door”) শিরোনামে একটি ছোট প্রবন্ধ লেখেন। যাতে তিনি ফ্লাইট নাইনটিন এর নিরুদ্দেশের কাহিনী বর্ণনা করেন এবং এই ত্রিভূজাকার অঞ্চলের রহস্যময় কাহিনী তুলে ধরেন।

১৯৬২ সালের এপ্রিল মাসে ফ্লাইট 19 নিয়ে আমেরিকান লিজান (American Legion) ম্যগাজিনে কিছু তথ্য প্রকাশিত হয়। বলা হয়ে থাকে এই ফ্লাইটের দলপতি কে নাকি বলতে শোনা গিয়েছে- We don’t know where we are, the water is green, no white. ।এতেই প্রথম ফ্লাইট 19 কে কোন অতিপ্রাকৃতিক ঘটনার সাথে যুক্ত করা হয়। এরপর ভিনসেন্ট গডিস (Vincent Gaddis) “প্রাণঘাতী বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল”( The Deadly Bermuda Triangle) নামে আর এক কাহিনী ফাঁদেন ১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এর উপর ভিত্তি করেই তিনি আরও বিস্তর বর্ণনা সহকারে লেখেন “ইনভিজিবল হরাইজন” (Invisible Horizons) মানে “অদৃশ্য দিগন্ত” নামের বই।  আরও অনেক লেখকই নিজ নিজ মনের মাধুরী মিশিয়ে এ বিষয়ে বই লেখেন, তারা হলেন জন ওয়ালেস স্পেন্সার, তিনি লিখেন “লিম্বো অফ দ্যা লস্ট” (Limbo of the Lost, 1969, repr. 1973), মানে “বিস্মৃত অন্তর্ধান” ; চার্লস বার্লিটজ (Charles Berlitz) লিখেন “দি বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল”(The Bermuda Triangle, 1974); রিচার্ড উইনার লিখেন “দ্যা ডেভিল’স ট্রায়াঙ্গেল” “শয়তানের ত্রিভূজ” (The Devil’s Triangle, 1974) নামের বই,, এছাড়া আরও অনেকেই লিখেছেন। এরা সবাই ঘুরেফিরে একার্ট ( Eckert) বর্ণিত অতিপ্রাকৃতিক ঘটনাই আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে উপস্থাপন করেছেন। 

ল্যারি কুসচ (Larry Kusche) এর ব্যাখ্যা :

১৯৭৫ সালে Larry Kusche প্রকাশ করেন The Bermuda Triangle Mystery: Solved বইখানা। ল্যারি ডেভিড কুসচ হলেন “অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি”-র রিসার্চ লাইব্রেরিয়ান । তার গবেষণায় তিনি চার্লস বার্লিটজ (Charles Berlitz) এর বর্ণনার সাথে প্রত্যক্ষ্যদর্শীদের বর্ণনার অসংগতি তুলে ধরেন। যেমন- যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকার পরেও বার্লিটজ (Charles Berlitz) বিখ্যাত ইয়টসম্যান ডোনাল্ড ক্রোহার্সট (Donald Crowhurt) এর অন্তর্ধানকে বর্ণনা করেছেন রহস্য হিসেবে। আরও একটি উদাহরণ হল- আটলান্টিকের এক বন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়ার তিন দিন পরে একটি আকরিকবাহী জাহাজের নিখোঁজ হবার কথা বার্লিটজ বর্ণনা করেছেন, আবার অন্য এক স্থানে একই জাহাজের কথা বর্ণনা করে বলেছেন সেটি নাকি প্রশান্ত মহাসাগরের একটি বন্দর থেকে ছাড়ার পর নিখোঁজ হয়েছিল। এছাড়াও কুসচ দেখান যে বর্ণিত দূর্ঘটনার একটি বড় অংশই ঘটেছে কথিত ত্রিভূজের সীমানার বাইরে। কুসচ এর গবেষণা ছিল খু্বই সাধারন। তিনি শুধু লেখকদের বর্ণনায় বিভিন্ন দূর্ঘটনার তারিখ, সময় ইত্যাদি অনুযায়ী সে সময়ের খবরের কাগজ থেকে আবহাওয়ার খবর আর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো সংগ্রহ করেছেন যা গল্পে লেখকরা বলেননি। কুসচ –এর গবেষণায় যা পাওয়া যায় তা হল-

  • বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলে যে পরিমাণ জাহাজ ও উড়োজাহাজ নিখোঁজ হওয়ায় কথা বলা হয় তার পরিমাণ বিশ্বের অন্যান্য সমুদ্রের তুলনায় বেশি নয়।
  • এ অঞ্চলে গ্রীষ্মকালীন ঘূর্ণিঝড় (tropical storms) নিয়মিত আঘাত হানে, যা জাহাজ ও উড়োজাহাজ নিখোঁজ হওয়ার অন্যতম কারণ। কিন্তু বার্লিটজ বা অন্য লেখকেরা এধরনের ঝড়ের কথা অনেকাংশেই এড়িয়ে গিয়েছেন।
  • অনেক ঘটনার বর্ণনাতেই লেখকেরা কল্পনার রং চড়িয়েছেন। আবার কোন নৌকা নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে দেরিতে বন্দরে ভিড়লে তাকে নিখোঁজ বলে‌ প্রচার করা হয়েছে।
  • আবার কখনোই ঘটেনি এমন অনেক ঘটনার কথা লেখকেরা বলেছেন। যেমন- ১৯৩৭ সালে ফ্লোরিডার ডেটোনা সমুদ্রতীরে ( Daytona Beach) একটি বিমান দূর্ঘটনার কথা বলা হয়, কিন্তু সেসময়ের খবরের কাগজ থেকে এ বিষয়ে কোন তথ্যই পাওয়া যায়নি।

কারন হিসেবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ :

হারিকেন (Hurricane) হল শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। ঐতিহাসিক ভাবেই জানা যায়- আটলান্টিক মহাসাগরে নিরক্ষ রেখার কাছাকাছি অঞ্চলে শক্তিশালী হারিকেনের কারণে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানী ঘটেছে। রেকর্ড অনুসারে ১৫২০ সালে স্প্যানিশ নৌবহর “ফ্রান্সিসকো দ্য বোবাডিলা” (Francisco de Bobadilla) এমনি একটি বিধ্বংসী হারিকেনের কবলে পড়ে ডুবে যায়।বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের কাহিনীর সাথে জড়িত অনেক ঘটনার জন্য এধরনের হারিকেনই দায়ী।

বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে হারিকেন ঝড়ের উপগ্রহ চিত্ৰ

গলফ স্ট্রিম হল মেক্সিকো উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে স্ট্রেইটস অব ফ্লোরিডা(Straits of Florida) হয়ে উত্তর আটলান্টিকের দিকে প্রবাহিত উষ্ঞ সমুদ্রস্রোত। একে বলা যায় মহা সমুদ্রের মাঝে এক নদী। নদীর স্রোতের মত গলফ স্ট্রিম ভাসমান বস্তু কে স্রোতের দিকে ভাসিয়ে নিতে পারে। যেমনি ঘটেছিল ১৯৬৭ সালের ২২ ডিসেম্বর “ উইচক্রাফট” নামের একটি প্রমোদতরীতে। মিয়ামি তীর হতে এক মাইল দূরে এর ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দিলে তার নাবিকরা তাদের অবস্থান কোস্ট গার্ডকে জানায়। কিন্তু কোস্ট গার্ডরা তাদেরকে ঐ নির্দিষ্ট স্থানে পায়নি।

কারন হিসেবে মানবিক ভুল :-

অনেক জাহাজ এবং বিমান নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার তদন্তে দেখা গিয়েছে এর অধিকাংশই চালকের ভুলের কারণে দূর্ঘটনায় পতিত হয়েছে। মানুষের ভুল খুবই স্বাভাবিক ঘটনা, আর এমনি ভুলের কারণে দূর্ঘটনা বারমুডা ট্রায়াঙ্গলেও ঘটেতে পারে। যেমন কোস্ট গার্ড ১৯৭২ সালে ভি.এ. ফগ( V.A. Fogg)-এর নিখোঁজ হবার কারণ হিসেবে বেনজিন এর পরিত্যাক্ত অংশ অপসারনের জন্য দক্ষ শ্রমিকের অভাবকে দায়ী করেছে। সম্ভবত ব্যবসায়ী হার্ভি কোনভার( Harvey Conover) এর ইয়ট টি তার অসাবধানতার কারণেই নিখোঁজ হয়। অনেক নিখোঁজের ঘটনারই উপসংহারে পৌঁছানো যায়নি, কারণ অনুসন্ধানের জন্য তাদের কোন ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

যুদ্ধাদি বা জলদস্যুদের কারনে ঘটা দুর্ঘটনা :

যুদ্ধের সময় অনেক জাহাজ শত্রু পক্ষের অতর্কিত আক্রমণে ডুবে গিয়ে থাকতে পারে বলে মনে করা হয়। এ কারণেও জাহাজ নিখোঁজ হতে পারে। তবে বিশ্বযুদ্ধ এর সময় বেশ কিছু জাহাজ, যাদের মনে করা হয় এমনি কারণে ডুবেছে, তাদের উপর অনুসন্ধান করা হয়। তবে শত্রু পক্ষের নথিপত্র, নির্দেশনার লগ বই ইত্যাদি পরীক্ষা করে তেমন কিছু প্রমাণ করা যায়নি। যেমন- মনে করা হয় ১৯১৮ সালে ইউ এস এস সাইক্লপস( USS Cyclops) এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সিস্টার শিপ প্রোটিয়াস(Proteu) এবং নিরিয়াস( Nereus) কে জার্মান ডুবোজাহাজ ডুবিয়ে দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে জার্মান রেকর্ড থেকে তার সত্যতা প্রমাণ করা যায়নি।

আবার ধারণা করা হয় জলদস্যুদের আক্রমণে অনেক জাহাজ নিখোঁজ হয়ে থাকতে পারে। সে সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিমাংশে এবং ভারত মহাসাগরে মালবাহী জাহাজ চুরি খুব সাধারণ ঘটনা ছিল। মাদক চোরাচালানকারীরা সুবিধা মত জাহাজ, নৌকা, ইয়ট ইত্যাদি চুরি করত মাদক চোরাচালানের জন্য। ১৫৬০ থেকে ১৭৬০ পর্যন্ত ক্যারিবিয়ান অঞ্চল ছিল জলদস্যুদের আখড়া। কুখ্যাত জলদস্যু এডওয়ার্ড টিচ ( Edward Teach Blackbeard ) এবং জেন ল্যাফিট্টি (Jean Lafitte) ছিল ঐ অঞ্চলের বিভীষিকা। তবে একথাও শোনা যায় যে জেন ল্যাফিট্টি(Jean Lafitte) নাকি বারমুডা ট্রায়াঙ্গলেই নিহত হয়েছিলেন।

দস্যুতার আরও এক ধরনের ফন্দি ছিল , যা পরিচলিত হত স্থল থেকে। এধরনের দস্যুরা সমুদ্রের উপকূলে বা কোনো দ্বীপে রাতে আলো জ্বালিয়ে জাহাজের নাবিকদের বিভ্রান্ত করত। নাবিকরা ঐ আলোকে বাতিঘরের আলো মনে করে সেদিকে অগ্রসর হত। তখন জাহাজগুলি ডুবন্ত পাহাড়ের সঙ্গে সংঘর্ষে ডুবে যেত। আর তারপরে ডোবা জাহাজের মালপত্র তীরের দিকে ভেসে এলে দস্যুরা তা সংগ্রহ করত।

প্রসঙ্গ, ফ্লাইট 19 :

ফ্লাইট নাইনটিন (Flight 19) : ফ্লাইট ১৯, ৫টি টিভিএম আভেঞ্জার টর্পেডো বোমারু বিমানের একটি, যেটি প্রশিক্ষণ চলাকালে ১৯৪৫ সালের ৫ ডিসেম্বর আটলান্টিক মহাসাগরে নিখোঁজ হয়। বিমানবাহিনীর ফ্লাইট পরিকল্পনা ছিল ফোর্ট লডারদেল থেকে ১৪৫ মাইল পূর্বে এবং ৭৩ মাইল উত্তরে গিয়ে, ১৪০ মাইল ফিরে এসে প্রশিক্ষণ শেষ করা। বিমানটি আর ফিরে আসেনি। নেভি তদন্তকারীরা নেভিগেশন ভুলের কারণে বিমানের জ্বালানীশূন্যতাকে বিমান নিখোঁজের কারণ বলে চিহ্নিত করে।

Flight 19

বিমানটি অনুসন্ধান এবং উদ্ধারের জন্য পাঠানো বিমানের মধ্যে একটি বিমান পিবিএম ম্যারিনার ১৩ জন ক্রুসহ নিখোঁজ হয়। ফ্লোরিডা উপকূল থাকা একটি ট্যাঙ্কার একটি বিস্ফোরণ দেখার রিপোর্ট করে  ব্যাপক তেল দেখার কথা বলে কিন্তু উদ্ধার অভিযানে এর সত্যতা পাওয়া যায়নি। দুর্ঘটনা শেষে আবহাওয়া দুর্যোগপূর্ণ হয়ে উঠে।  সূত্র মতে, সমসাময়িক কালে বাষ্প লিকের কারণে পুরো জ্বালানী ভর্তি অবস্থায় বিস্ফোরণ ঘটার ইতিহাস ছিল।

ইউ এস এস সাইক্লপস( USS Cyclops) :

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌ- বাহিনীর ইতিহাসে অন্যতম (যুদ্ধ ছাড়া) বড় ক্ষতি হচ্ছে ইউ এস এস সাইক্লপস নিখোঁজ হয়ে যাওয়া। অতিরিক্ত ম্যাঙ্গানিজ আকরিক ভর্তি বিমানটি ১৯১৮ সালের ৪ মার্চ বার্বাডোস দ্বীপ থেকে ওড়ার পর একটি ইঞ্জিন বিকল হওয়ার জন্য ৩০৯ জনকে নিয়ে নিখোঁজ হয়। যদিও এই নিখোঁজ হওয়ার পিছনে কারো মতে ঝড় দায়ী, কারো মত ডুবে গেছে আবার কেউ এই ক্ষতির জন্য শত্রুপক্ষকে দায়ী করেছেন।  উপরন্তু, সাইক্লপস-এর মত আর দুইটি ছোট জাহাজ প্রোটিউস এবং নেরেউস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে নিখোঁজ হয়। সাইক্লপসের মত এই জাহাজদুটিতেও অতিরিক্ত আকরিকে ভর্তি ছিল। তিনটি ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত পণ্য ধারণে অক্ষমতার কারণেই জাহাজডুবি হয় বলেই ব্যাপক ধারণা করা হয়।

USS Cyclops

বারমুডা ট্রায়াঙ্গল এ ঘটে যাওয়া কিছু বিমান দুর্ঘটনা :

  • ১৯৪৫: জুলাই ১০, টমাস আর্থার গার্নার, এএমএম৩, ইউএসএন, ১১ জন অন্য সদস্যসহ বারমুডা ট্রায়াঙ্গালে হারিয়ে যান। তারা ৯ জুলাই ১৯৪৫ তারিখ ৭:০৭ মিনিটে ব্যানানা রিভারের নাভাল এয়ার স্টেশন থেকে রওনা দেন। তাদের সর্বশেষ অবস্থান জানা যায় ১০ জুলাই ১৯৪৫ রাত ১:১৬-এ। কিন্তু তারপরে তাদের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
  • ১৯৪৫: ডিসেম্বর ৫, ফ্লাইট 19, ১৪ জন লোকসহ হাড়িয়ে যায় এবং একই দিনে ১৩ জন লোকসহ ফ্লাইট 19 কে খুজতে গিয়ে পিবিএম মেরিনার হাড়িয়ে যায়।
  • ১৯৪৮: জানুয়ারি ৩০, আভ্রো টুডোর জি-এএইচএনটি স্টার টাইগার ৬জন সদস্য ও ২৫ জন যাত্রীসহ হারিয়ে যায়।
  • ১৯৪৮:ডিসেম্বর ২৮, ডগলাস ডিসি-৩ এনসিং৬০০২ তিনজন সদস্য ও ৩৬জন যাত্রীসহ হারিয়ে যায়।
  • ১৯৪৯: জানুয়ারি ১৭, আভ্রো টুডোর জি-এজিআরই স্টার এরিয়েল সাতজন সদস্য ও ১৩জন যাত্রীসহ কিন্ডলে ফিল্ড, বারমুডা থেকে জ্যামাইকার দিকে রওনা দেওয়ার পরে হারিয়ে যায়।
  • ১৯৬২: জানুয়ারি ৮, একটি ইউএসএএফ কেবি-৫০ ৫১-০৪৬৫ হারিয়ে যায়।

রহস্যের সন্ধান :

তবে কি বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে কোনো রহস্য নেই? আছে বটে। কয়েকটি ঘটনার যে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা আজও পাওয়া যায়নি তা সত্য। কিন্তু সেগুলোতে যে আসলে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের কোনো প্রভাব আছে তারও প্রমাণ নেই। তবে একটি মজার থিওরি দিয়েছিলেন কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির স্যাটেলাইট মিটিওরলজিস্ট ড. স্টিভ মিলার। ২০১৬ সালের অক্টোবরে তিনি নাসার স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে সায়েন্স চ্যানেলের What on Earth প্রোগ্রামকে জানান, বারমুডা ট্রায়াঙ্গল এলাকা জুড়ে জায়গায় জায়গায় ষড়ভুজ মেঘ দেখা যায়। এখানে এমনকি ঘণ্টায় ১৭০ মাইল গতি পর্যন্ত বায়ু বয়ে যায়। এই এয়ার-পকেটগুলোই নাকি জাহাজ বা প্লেন দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। কোনো কোনো মেঘ ২০ থেকে ৫৫ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। তবে তিনি জানান, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হলে আরো গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে ।

১৯৭৫ সালে Larry Kusche তার The Bermuda Triangle Mystery: Solved বইতে যুক্তি দেখান যে, বারমুডা ট্রায়াঙ্গল নাম যিনি দিয়েছিলেন সেই গ্যাডিস ও অন্য লেখকেরা আসলে অনেক জায়গায় অতিরঞ্জন করেছেন। এমনকি গুজব আর শোনা কথা থেকেও তারা কাহিনী নিয়েছেন। তিনি অনেক কাহিনীর অসঙ্গতি প্রমাণ করে দেন। আরো মজার ব্যাপার, বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের শিকার বলে চালিয়ে দেয়া বেশিরভাগ ঘটনাই আসলে এ ত্রিভুজের বাইরে ঘটেছিল। তিনি কাহিনীগুলোর সত্যতা ঘাটতে গিয়ে দেখেন, আসলে অনেক কাহিনী আদৌ ঘটেনি। আবার এমন ঘটনাও বলা হয়েছে, যেখানে এক জাহাজের উধাও হয়ে যাবার কাহিনী বলা হলেও, সেটা যে পরে ফিরে এসেছিল সে ঘটনা বলা হয়নি। ট্রপিক্যাল সাইক্লোন প্রবণ এ এলাকায় জাহাজডুবি খুব অবাক করা কিছু না।

প্রসঙ্গত, অতিরঞ্জনের একটা উদাহরণ দেওয়া যাক , ফ্লাইট নাইনটিন নিয়ে। এটি সত্য যে, তদন্তে কারণ হিসেবে লেখা হয়েছিল ‘অজ্ঞাত’। কিন্তু এর আগে আসলে পাইলটের ত্রুটি লেখা ছিল, কিন্তু মৃতদের স্বজনদের চাপে সেটা পরিবর্তন করা হয়। হারিয়ে যাবার আগে পাইলট বলছিলেন, কম্পাস কাজ করছে না, তিনি কোথায় আছেন বুঝতে পারছেন না, হয়তো ফ্লোরিডার দিকে।

GPS এর সুবিধাহীন যুগে পাইলটদের নিজস্ব অবস্থান বোঝার উপায় ছিল যাত্রাশুরুর বিন্দু ও কতক্ষণ কত বেগে চালিয়েছেন সেটা বুঝে- তাই একবার পথ হারালে সমুদ্রের উপর অবস্থান বোঝা বড্ড কঠিন ছিল। আর জ্বালানি শেষ দিকে থাকলে তো কথাই নেই। এটাই আসলে ফ্লাইট নাইনটিনের উধাও হবার পেছনে মূল রিপোর্ট ছিল। ফ্লাইট 19 কে খুঁজতে যাওয়া বিমান কোনোদিন ফিরে আসেনি, এটা আংশিক সত্য। আসলে, সার্চ পার্টির দুটো মার্টিন মেরিনার প্লেনের একটি প্লেন ফিরে আসেনি। কারণ, যাবার পথে উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মাঝেই তেলের ট্যাংকে বিস্ফোরণ হয়েছিল সেটির। খারাপ আবহাওয়ার কারণে এর ধ্বংসাবশেষও ফেরানো যায়নি । সেটাই আসল ঘটনাকে পেছনে ফেলে গল্পকে জনপ্রিয়তা দিয়েছিল। সম্ভবত, ২২ জন ক্রুর একজন ভুলবশত সিগারেট ধরিয়ে ফেলেছিলেন, ভুলে গিয়েছিলেন এরকম পরিবেশে কেবিনে বিশেষ গ্যাস থাকে- সেখান থেকেই বিস্ফোরণ।

আবার আরো একটি ঘটনা ,সেই সালফারবাহী জাহাজ- ‘মেরিন সালফার কুইন’ । জাহাজটি কিন্তু খুবই দুর্ঘটনাপ্রবণ ছিল, দুর্বলও ছিল- কোস্ট গার্ড বলেছিল যে, জাহাজটি চালানোই উচিত না, এটা দুর্ঘটনার অপেক্ষায় আছে। এটা ভাগ্যের পরিহাস যে, এর অন্তিম মুহূর্তের কারণে দোষটা পড়ে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ওপর, জাহাজের ওপর নয়।

বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের আদতে কোনো রহস্য যদি না-ও থাকে, তবুও অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে রহস্যের খোরাক হিসেবে জনমানসে আগ্রহ জাগিয়ে গিয়েছে এ জলজ ত্রিভুজ। বহু জনপ্রিয় গ্রন্থের কাহিনীর খোরাক জুগিয়েছে বা জুগিয়ে চলেছে এই বারমুডা ট্রায়াঙ্গল।

2 thoughts on “বারমুডা ট্রায়াঙ্গল (Bermuda Triangle) রহস্যের সন্ধানে

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান